শাহ লাভলী রহমান: অপ্রতীম, তোর মৃত্যুর পর সবচেয়ে নিষ্ঠুর প্রশ্নটি হয়তো তোর মৃত্যুর কারণ নিয়ে নয়, তোর হাতে কী ছিল, তা নিয়ে, একটি আইফোনকে নিয়ে। একটি যন্ত্র। কাচ, ধাতু, আলো আর প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি একটি ছোট্ট বস্তু। কিন্তু সেই বস্তুটিই কি একটি শিশুর মৃত্যুর কারণ হতে পারে? নাকি আমরা এমন এক সমাজে এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে একটি শিশুর মৃত্যুর দায় খুঁজতে গিয়ে আমরা প্রথমে শিশুটির হাতের মুঠো খুলে দেখি। তারপর তার পোশাক, তার চলাফেরা, তার সময়, তার পরিচয়; অথচ শেষ পর্যন্ত যে প্রশ্নটি করার কথা, সেটি করতে ভুলে যাই।
একটি শিশু নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারল না কেন?
অপ্রতীমের হাতে যদি আইফোন না থাকত, তাহলে কি তার জীবনের মূল্য বেড়ে যেত?
তার হাতে যদি একটি সাধারণ ফোন থাকত, তাহলে কি সে আরও নিরাপদ থাকত?
আর যদি কোন ফোনই না থাকত, তাহলে কি পৃথিবী তার জন্য হঠাৎ নিরাপদ হয়ে যেত?
উত্তরটি- না। কারণ কোন প্রযুক্তি একটি শিশুর মৃত্যুর নৈতিক দায় বহন করে না। দায় থাকে মানুষের আচরণে, সামাজিক পরিবেশে, নিরাপত্তার ব্যবস্থায় এবং সেই ব্যর্থতায়, যেখানে একটি শিশুকে রক্ষা করার দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও তাকে নিরাপদে রাখা যায় নি।
একটি আইফোন শিশুকে হত্যা করে না। মানুষ হত্যা করতে পারে। অব্যবস্থাপনা বিপদ ডেকে আনতে পারে। নিরাপত্তার ঘাটতি একটি জীবনকে অনিরাপদ করে তুলতে পারে। তাই অপ্রতীমের মৃত্যুকে তার হাতে থাকা একটি ফোনের সঙ্গে বেঁধে ফেলা শুধু ভুল প্রশ্ন নয়, এটি আমাদের আসল প্রশ্ন থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। আমরা কি আবারও সেই পুরোনো অভ্যাসে ফিরে যাচ্ছি, যেখানে বিপন্ন মানুষের দিকে আঙুল তুলে বলা হয়,
সে সেখানে গেল কেন?
তার হাতে ওটা ছিল কেন?
সে একা ছিল কেন?
বাবা-মা তাকে যেতে দিলেন কেন?
কিন্তু খুব কম মানুষ প্রশ্ন করে, যে জায়গায় একটি শিশু নিরাপদ থাকার কথা, সেখানে সে নিরাপদ ছিল না কেন? এই প্রশ্নটিই সবচেয়ে কঠিন। কারণ এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের নিজেদের দিকে তাকাতে হয়, রাষ্ট্রের দিকে তাকাতে হয়, সমাজের দিকে তাকাতে হয়, আইনের প্রয়োগের দিকে তাকাতে হয়, মানুষের বিবেকের দিকে তাকাতে হয়। আর নিজের আয়নায় তাকানো সবসময়ই সবচেয়ে অস্বস্তিকর। অপ্রতীম তো জানত না, তার মৃত্যুর পর তার হাতে থাকা ফোনটি নিয়েও আলোচনা হবে। সে জানত না, তার ছোট্ট জীবনটি একদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে পরিণত হবে। সে জানত না, তার ছবি দেখে কেউ কাঁদবে, কেউ ক্ষুব্ধ হবে, কেউ প্রশ্ন করবে, আবার কেউ হয়তো তার মৃত্যুর মধ্যেও তারই কোন ভুল খুঁজবে। সে শুধু একটি শিশু ছিল। তার সামনে ছিল পৃথিবীর দীর্ঘ রাস্তা, ছিল স্কুল, ছিল বন্ধুত্ব, ছিল কৈশোরের অগণিত বিকেল, ছিল বড় হওয়ার স্বপ্ন, ছিল মায়ের ডাকে ফিরে আসার অভ্যাস, ছিল বাবার চোখে ভবিষ্যৎ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা।
একটি আইফোনের চেয়ে তার সেই ভবিষ্যৎ কি কম মূল্যবান ছিল? আমরা প্রযুক্তির যুগে বাস করি। শিশুর হাতে স্মার্টফোন থাকবে এটাই বাস্তবতা। কিন্তু স্মার্টফোনের চেয়ে আমাদের সমাজকে আরও স্মার্ট হতে হবে। প্রযুক্তিকে ভয় দেখিয়ে নয়, নিরাপদ ব্যবহার শেখানোর মাধ্যমে; শিশুকে দোষী বানিয়ে নয়, তার চারপাশকে নিরাপদ করে। কারণ শিশুর হাতে থাকা ফোনটি সমস্যা নয়; সমস্যাটি হলো শিশুটি যদি আমাদের সমাজের মাঝখানে থেকেও নিরাপদ না থাকে। আজ অপ্রতীমের ছবির দিকে তাকালে তাই আইফোনটির দিকে তাকাতে ইচ্ছে করে না। তাকাতে ইচ্ছে করে তার চোখের দিকে। সেই চোখে হয়তো কোন অভিযোগ নেই। আছে শুধু অসমাপ্ত একটি জীবন।
একটি জীবন, যে জীবন আমাদের চোখের সামনে প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে “আমার হাতে কী ছিল, সেটা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? আমাকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার দায়িত্বটা কার ছিল?” এই প্রশ্নের উত্তর যদি আমরা আইফোনের মধ্যে খুঁজি, তাহলে হয়তো নিজেদের দায় এড়িয়ে যাব। আর যদি মানুষের মধ্যে খুঁজি, তাহলে হয়তো একদিন সত্যিই বুঝতে পারব -একটি শিশুর মৃত্যুর কারণ তার হাতে থাকা ফোন নয়; একটি শিশুকে নিরাপদে বাঁচতে না দেওয়াই আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।
অপ্রতীম, তোর হাতে আইফোন ছিল, কিন্তু তোর প্রয়োজন ছিল একটি নিরাপদ পৃথিবী। তুই প্রযুক্তির কাছে নিরাপত্তা চাসনি। তুই শুধু মানুষের কাছে মানুষ হয়ে থাকার অধিকার নিয়ে পৃথিবীতে এসেছিলি। সেই অধিকার আমরা রক্ষা করতে পারিনি। আজ তাই প্রশ্নটি আইফোনকে ঘিরে নয়-আমাদের বিবেককে। আইফোন কি একটি শিশুর মৃত্যুর কাল? না। একটি শিশুর মৃত্যুর আগে যে সমাজ তার নিরাপত্তার প্রশ্নটি ভুলে যায়, আসল প্রশ্নটি সেখানে।
লেখক: যুক্তরাজ্যে প্রবাসী, কবি ও প্রাবন্ধিক