শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:০০ পূর্বাহ্ন

নির্বাচিত হওয়ার আগেই জনগণের সেবা করুন—ভোট চাওয়ার আগে মানুষের আস্থা অর্জনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হোন

Md Shahidul islam / ১৪ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
প্রকাশিত হয়েছেঃ শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মুহাম্মদ আসাদ উল্লাহ (বি.এসসি.)

নির্বাচন এলেই আমাদের সামনে একটি পরিচিত দৃশ্য হাজির হয়। পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন, গণসংযোগ, সভা-সমাবেশ আর নানা প্রতিশ্রুতিতে সরগরম হয়ে ওঠে জনপদ। প্রার্থীরা মানুষের দ্বারে দ্বারে যান, শুভেচ্ছা বিনিময় করেন, নিজেদের যোগ্যতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়—নির্বাচনের আগে, অর্থাৎ ভোট চাওয়ার সময় আসার আগেই জনগণের জন্য তিনি কী করেছেন?

জনপ্রতিনিধিত্ব কোনো ব্যক্তিগত মর্যাদা, ক্ষমতা কিংবা সামাজিক পরিচিতি অর্জনের উপায় নয়। এটি মূলত জনগণের আস্থা, দায়িত্ব ও আমানতের বিষয়। একজন মানুষ নির্বাচিত হওয়ার পর জনগণের সেবা করবেন—এটি তাঁর দায়িত্বের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু তারও আগে একজন সম্ভাব্য জনপ্রতিনিধির উচিত মানুষের পাশে থাকার মাধ্যমে নিজের দায়িত্ববোধ, সততা ও জনসম্পৃক্ততার পরিচয় দেওয়া।

নির্বাচন কি জনসেবার শুরু?

জনসেবা কোনো নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার সঙ্গে শুরু হওয়ার কথা নয়। মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানো, অসহায় মানুষের কথা শোনা, সামাজিক সমস্যায় ভূমিকা রাখা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ কিংবা মানবিক সংকটে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া—এসব কাজের জন্য নির্বাচিত পদ অপরিহার্য নয়।

বরং একজন ব্যক্তি যদি নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই মানুষের পাশে থাকেন, তাহলে তাঁর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জনগণের কাছে একটি বাস্তব ধারণা তৈরি হয়। তিনি কীভাবে কথা বলেন, মানুষের সমস্যা কীভাবে বোঝেন, দায়িত্ব পেলে তা পালনে কতটা আন্তরিক—এসবের কিছুটা মূল্যায়ন তাঁর পূর্ববর্তী কর্মকাণ্ড থেকেই করা সম্ভব।

অন্যদিকে, শুধু নির্বাচন সামনে রেখে হঠাৎ মানুষের কাছে যাওয়া এবং ভোট শেষ হওয়ার পর সেই যোগাযোগ হারিয়ে ফেলা জনসম্পৃক্ততার স্থায়ী সংস্কৃতি তৈরি করতে পারে না। ভোটের সময় মানুষের দরজায় কড়া নাড়া আর বছরের পর বছর মানুষের পাশে থাকা—দুটিকে এক করে দেখার সুযোগ নেই।

প্রতিশ্রুতির আগে অতীতের হিসাব

নির্বাচনের সময় প্রতিশ্রুতি দেওয়া সহজ। উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, রাস্তা, শিক্ষা, চিকিৎসা, নাগরিক সুবিধা—বিভিন্ন বিষয়ে নানা পরিকল্পনার কথা বলা যায়। কিন্তু প্রতিশ্রুতির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো অতীতের কাজের হিসাব।

একজন সম্ভাব্য জনপ্রতিনিধিকে তাই প্রশ্ন করা যেতে পারে—তিনি নির্বাচিত হওয়ার আগেই সমাজের জন্য কী করেছেন? মানুষের কোনো সংকটে পাশে দাঁড়িয়েছেন কি? এলাকার কোনো সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নিয়েছেন কি? নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের কল্যাণে নিয়মিত ভূমিকা রেখেছেন কি? মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কি শুধু নির্বাচনের সময়কেন্দ্রিক, নাকি দীর্ঘদিনের?

কারণ মুখের প্রতিশ্রুতি ভবিষ্যতের দাবি; কিন্তু অতীতের কাজ সেই দাবির সবচেয়ে দৃশ্যমান পরীক্ষা। যে ব্যক্তি নির্বাচিত হওয়ার আগেই মানুষের জন্য কাজ করার চেষ্টা করেছেন, তাঁর জনসম্পৃক্ততার একটি বাস্তব ভিত্তি থাকে। আর যে ব্যক্তি শুধু নির্বাচনের সময় সক্রিয় হন, তাঁর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও আন্তরিকতা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলার অবকাশ থেকেই যায়।

মানুষের আস্থা পোস্টারে ছাপা যায় না

পোস্টার-ব্যানারে একজন প্রার্থীর ছবি বড় করে ছাপা যায়, স্লোগান লেখা যায়, নানা পরিচয় তুলে ধরা যায়; কিন্তু মানুষের আস্থা সেখানে ছাপা যায় না। আস্থা অর্জন করতে হয় আচরণ, সততা, দায়িত্ববোধ ও ধারাবাহিক কাজের মাধ্যমে।

মানুষকে সম্মান করা, সাধারণ মানুষের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং নিজের অবস্থান থেকে জনকল্যাণে ভূমিকা রাখা—এসবই একজন মানুষের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তি তৈরি করে।

ভোট পাওয়ার জন্য মানুষের কাছে যাওয়া আর মানুষের পাশে থাকার কারণে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠা—দুটো এক বিষয় নয়। প্রথমটি নির্বাচনী প্রয়োজন হতে পারে; দ্বিতীয়টি দীর্ঘদিনের জনসম্পৃক্ততার ফল।

ভোটারদেরও প্রশ্ন করতে হবে

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটার শুধু ভোট দেওয়ার ব্যক্তি নন; তিনি জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের অন্যতম প্রধান অংশীদার। তাই ভোট দেওয়ার আগে প্রার্থীর বক্তব্য শোনার পাশাপাশি তাঁর অতীত কর্মকাণ্ড সম্পর্কেও প্রশ্ন করা প্রয়োজন।

প্রার্থী কী বলেছেন—তার পাশাপাশি তিনি কী করেছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মানুষের সঙ্গে কতটা যুক্ত ছিলেন, সামাজিক দায়িত্ব পালনে তাঁর ভূমিকা কী ছিল, সংকটে তাঁর অবস্থান কী ছিল, সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর আচরণ কেমন—এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।

প্রশ্নটি হওয়া উচিত খুবই সরল—“আপনি আমাদের কাছে ভোট চাইছেন; কিন্তু ভোট চাওয়ার আগে আমাদের জন্য কী করেছেন?”

এই প্রশ্ন কোনো ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে নয়। বরং এটি একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক ও নাগরিক সংস্কৃতির অংশ। কারণ জনগণের ভোট চাওয়া যেমন একটি অধিকার, তেমনি ভোটারদেরও প্রার্থীর অতীত কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে চাওয়ার অধিকার রয়েছে।

রাজনীতির সংস্কৃতি বদলাবে কীভাবে?

রাজনীতিতে যদি শুধু নির্বাচনের সময় জনসম্পৃক্ততার প্রবণতা তৈরি হয়, তাহলে জনসেবাও অনেক সময় নির্বাচনী কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তে পারে। এই সংস্কৃতি পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন নির্বাচনের বাইরেও মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও সামাজিক দায়িত্ব পালনের চর্চা।

জনপ্রতিনিধি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকলে নির্বাচনের কয়েক মাস আগে নয়—অনেক আগে থেকেই মানুষের সঙ্গে কাজের সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন। কারণ জনসেবা কোনো প্রচারণার বিষয় নয়; এটি একটি ধারাবাহিক সামাজিক দায়িত্ব।

একজন মানুষ নির্বাচিত না হয়েও মানুষের জন্য কাজ করতে পারেন। বরং নির্বাচিত হওয়ার আগেই যদি তিনি মানুষের সমস্যা বুঝতে এবং সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারেন, তাহলে নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর দায়িত্ব সম্পর্কে ধারণাটিও আরও বাস্তব ও জনমুখী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

জনপ্রতিনিধিত্বের আগে জনসেবার পরিচয়

জনপ্রতিনিধি হওয়ার আগে একজন মানুষকে নিজেকে একজন প্রকৃত জনসেবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা উচিত। কারণ পদ মানুষকে দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে; কিন্তু মানুষের আস্থা অর্জন করে তার ব্যবহার, সততা, কর্ম ও দায়িত্ববোধ।

নির্বাচনের সময় প্রতিটি প্রার্থীকে তাই শুধু বলতে হবে না—তিনি কী করবেন। বরং তাঁর অতীত কর্মকাণ্ডও যেন মানুষের সামনে একটি বাস্তব উত্তর হয়ে দাঁড়ায়। মানুষের কাছে তাঁর পরিচয় যেন শুধু পোস্টার, ব্যানার কিংবা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ না থাকে।

জনসেবার দরজা কোনো নির্বাচনী তফসিলের সঙ্গে খোলে না। এটি মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে খোলা থাকে। তাই যারা ভবিষ্যতে জনপ্রতিনিধি হতে চান, তাঁদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি হতে পারে—নির্বাচনের আগেই মানুষের পাশে দাঁড়ানো, মানুষের কথা শোনা এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের কল্যাণে কাজ করা।

কারণ নির্বাচন একজন মানুষকে জনপ্রতিনিধির পদ দিতে পারে; কিন্তু দীর্ঘদিনের সততা, দায়িত্ববোধ ও জনসেবাই তাঁকে মানুষের কাছে প্রকৃত জনসেবক হিসেবে পরিচিত করে।

আর সেই কারণেই গণতান্ত্রিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত—

ভোট চাওয়ার আগে জনগণের জন্য আপনি কী করেছেন?

এই প্রশ্নের উত্তর বক্তৃতায় নয়, কাজের মাধ্যমে দেওয়া হোক। প্রতিশ্রুতির আগে কাজের প্রমাণ আসুক। নির্বাচনের আগে জনসেবার পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হোক। আর জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক যেন শুধু ভোটের দিনের জন্য নয়—সারা বছরের জন্য হয়।

জনস্বার্থে শুভেচ্ছান্তে—

মুহাম্মদ আসাদ উল্লাহ (বি.এসসি.)
সংগঠক, শিক্ষানুরাগী, পরামর্শক ও সমাজসেবক
আখাউড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

আজীবন সদস্য
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ইউনিট

Share this news as a Photo Card


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

আরো সংবাদ
17 September 2026

নির্বাচিত হওয়ার আগেই জনগণের সেবা করুন—ভোট চাওয়ার আগে মানুষের আস্থা অর্জনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হোন

www.promothalo.com
17 September 2026

নির্বাচিত হওয়ার আগেই জনগণের সেবা করুন—ভোট চাওয়ার আগে মানুষের আস্থা অর্জনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হোন

www.promothalo.com