রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২০ পূর্বাহ্ন

মানুষ চেনার মূল্য

Md Shahidul islam / ৪৩ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
প্রকাশিত হয়েছেঃ শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মানুষ চেনার
মূল্য 

মানুষ চেনার শিক্ষা কোনো বইয়ে লেখা থাকে না। এই শিক্ষা নিতে হয় জীবন থেকে—বিশ্বাস করতে করতে, মানুষের পাশে দাঁড়াতে দাঁড়াতে, কখনো ভালোবেসে, কখনো প্রতারিত হয়ে, আবার কখনো নিজের সরলতার মূল্য দিয়ে। জীবনের দীর্ঘ পথচলায় আজ মনে হয়, মানুষকে চেনার জন্য চোখের চেয়ে সময়ের প্রয়োজন বেশি। কারণ মানুষ মুখে নিজের যে পরিচয় দেয়, সময়ের পরীক্ষায় তার চেয়ে অনেক গভীর একটি পরিচয় প্রকাশ পায়। সবচেয়ে কঠিন আঘাত অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে আসে না; আসে সেই মানুষটির কাছ থেকে, যাকে একসময় নিজের মানুষ বলে বিশ্বাস করেছিলাম। বাইরের মানুষের আঘাতের জন্য মানুষ প্রস্তুত থাকে, কিন্তু আপন ভেবে যাকে হৃদয়ের দরজা খুলে দেওয়া হয়, তার আচরণ যখন বদলে যায়—সেই আঘাত শুধু কষ্ট দেয় না, মানুষের বিশ্বাসের ভিতও নাড়িয়ে দেয়।

জীবনের অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে—মানুষের প্রয়োজন আর মানুষের সম্পর্ককে সবসময় এক করে দেখা যায় না। প্রয়োজনের সময়ে যে কাছে আসে, সে-ই আপন—এমন নয়। আবার যে নীরবে দূরে থাকে, সে-ই পর—তাও নয়। কেউ সম্পর্ককে হৃদয়ে ধারণ করে, কেউ সম্পর্ককে প্রয়োজনের হিসাবের মধ্যে রাখে। এই পার্থক্য বোঝা যায় তখনই, যখন জীবনের সুদিনের আলো কিছুটা ম্লান হয়ে আসে এবং চারপাশে থাকা মানুষগুলোর প্রকৃত অবস্থান ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সুদিনে পাশে দাঁড়ানোর মানুষের অভাব হয় না; কিন্তু দুর্দিন মানুষের চারপাশকে অদ্ভুতভাবে নীরব করে দেয়। তখনই বোঝা যায়—কে সত্যিই পাশে ছিল, কে শুধু সময়ের সঙ্গে ছিল, আর কে ছিল নিজের প্রয়োজনের কারণে।

এই জায়গাতেই মানুষ চেনার সবচেয়ে কঠিন শিক্ষা। তবু কাউকে সাহায্য করার আগে আমি কখনো এই হিসাব করতে চাইনি—একদিন সে আমার উপকারের প্রতিদান দেবে কি না। কারণ বিপদের সময়ে একজন মানুষের পাশে দাঁড়ানো, কাউকে পথ দেখানো, সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করা—এসবের প্রকৃত মূল্য প্রতিদানে নয়; মূল্য রয়েছে মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধে। আমি যদি কারও প্রয়োজনের দিনে তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকি, সেটি আমার মানবিকতার পরিচয়। সে পরে সেই সহযোগিতার মর্যাদা রাখবে কি না, সেটি তার চরিত্রের পরিচয়। কিন্তু জীবন সবসময় এত সরল থাকে না।

কখনো কখনো দেখা যায়, যে মানুষটিকে দাঁড়াতে সাহায্য করেছি, সময়ের পরিবর্তনে সেই মানুষটিই আমার দিকে আঘাতের হাত বাড়িয়েছে। যে হাতে একদিন ভরসা দিয়েছি, সেই হাতই কোনো একদিন দূরত্বের দেয়াল তুলেছে। যে মানুষটির জন্য নিজের সময়, শ্রম কিংবা সামর্থ্য ব্যয় করেছি, প্রয়োজন শেষ হওয়ার পর তার কাছ থেকেই এসেছে অবহেলা। এমন অভিজ্ঞতা মানুষকে ভেতর থেকে আহত করে। কিন্তু বয়স ও অভিজ্ঞতা একসময় শেখায়—সবাইকে নিজের মতো ভাবা যায় না, আর নিজের ভালোত্ব দিয়ে অন্যের চরিত্রের নিশ্চয়তাও দেওয়া যায় না।

অন্যের অকৃতজ্ঞতা আমার মানবিকতার পরাজয় নয়। আমি যে সময়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলাম, তখন আমার বিবেক আমাকে সেটিই করতে বলেছিল। আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি। সেই সহযোগিতার মর্যাদা অন্যজন রেখেছে কি না, সেটি তার হিসাব। অন্যের আচরণের দায় নিজের বিবেকের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার কোনো কারণ নেই। এখানেই আত্মমর্যাদার পরীক্ষা। ভালো মানুষ হওয়া মানে সবার অন্যায় নীরবে সহ্য করে যাওয়া নয়। কাউকে ভালোবাসা মানে নিজের সম্মান বিসর্জন দেওয়া নয়। কাউকে সাহায্য করা মানে তার কাছে নিজের আত্মমর্যাদা বন্ধক রাখা নয়।

মানবিকতার যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন সীমারেখার। কারণ সীমারেখাহীন ভালোত্ব অনেক সময় অন্যের সুযোগ নেওয়ার পথ খুলে দেয়। নিজের প্রতি অন্যায়কে বারবার ক্ষমা করতে করতে একসময় মানুষ নিজের কাছেই অন্যায় করতে শুরু করে। তাই জীবনের একটি পর্যায়ে এসে কিছু মানুষকে কাছে রাখতে হয়, কিছু মানুষকে দূরে রাখতে হয়। দূরে সরে যাওয়া মানেই ঘৃণা নয়; সম্পর্কের ইতি টানা মানেই প্রতিশোধও নয়। অনেক সময় নীরবে সরে আসাই সবচেয়ে পরিণত সিদ্ধান্ত। কারণ প্রতিটি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব একা একজন মানুষের নয়।

আঘাত পাওয়ার পর মানুষের সবচেয়ে বড় ভুল হলো—নিজের ভেতরের ভালো মানুষটিকে মেরে ফেলা। একজন বিশ্বাস ভেঙেছে বলে সবাইকে অবিশ্বাস করা যায় না। একজন অকৃতজ্ঞ হয়েছে বলে পৃথিবীর সব মানুষকে অকৃতজ্ঞ ভাবা যায় না। একজন ভালোবাসার মর্যাদা দেয়নি বলে ভালোবাসাকেই অস্বীকার করা যায় না। অন্যের অন্ধকার নিজের ভেতরে ধারণ করে রাখলে শেষ পর্যন্ত সেই অন্ধকারই নিজের জীবনকে গ্রাস করে। তাই আঘাতের পর আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন—আরও নিষ্ঠুর হওয়া নয়।

কাকে বিশ্বাস করব, কাকে কতটা কাছে রাখব, কোথায় থামব—এসব সিদ্ধান্তে আবেগের পাশাপাশি অভিজ্ঞতারও প্রয়োজন আছে। মানুষকে ভালোবাসতে হবে, কিন্তু নিজের বিচারবোধ হারিয়ে নয়। বিশ্বাস করতে হবে, কিন্তু চোখ বন্ধ করে নয়। সময় আমাকে আরও একটি বিষয় শিখিয়েছে—মানুষ কী বলেছে, তার চেয়ে মানুষ কী করেছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কথার সৌন্দর্যে মানুষকে চেনা যায় না; চেনা যায় তার আচরণের মুহূর্তে। বিশেষ করে সেই সময়ে, যখন তার কাছ থেকে কোনো লাভ পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।

যে মানুষ আমার ভালো সময়ে পাশে ছিল, তার উপস্থিতি আনন্দের। কিন্তু যে মানুষ আমার খারাপ সময়ে কোনো স্বার্থ ছাড়াই পাশে দাঁড়িয়েছে, তার মূল্য অন্যরকম। আবার যে মানুষ আমার দুর্দিনকে নিজের সুবিধা নেওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখেছে, তার পরিচয়ও তখন আর গোপন থাকে না। এ কারণেই এখন আর প্রতিটি আঘাতের জবাব দিতে ইচ্ছে করে না। প্রতিটি ভুল বোঝাবুঝির ব্যাখ্যা দিতেও ইচ্ছে করে না। কে কেন বদলে গেল, কেন দূরে সরে গেল, কেন একদিনের আপন মানুষ পর হয়ে গেল—সব প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি নয়।

কিছু মানুষকে সময়ের হাতে ছেড়ে দিতে হয়। কারণ সময় এমন এক সাক্ষী, যার সামনে মানুষের সাজানো পরিচয় বেশিদিন টিকে থাকে না। মানুষ অনেকের কাছে নিজের আচরণের ব্যাখ্যা দিতে পারে, নিজের ভুল আড়াল করতে পারে; কিন্তু সময় ধীরে ধীরে সবকিছুর প্রকৃত হিসাব সামনে নিয়ে আসে। সময় কাউকে শাস্তি দেয় না—শুধু মানুষের কাজগুলো একদিন তার নিজের পরিচয়ের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।

তাই প্রতিশোধের চেয়ে নীরবতাকে অনেক সময় বেশি শক্তিশালী মনে হয়। প্রতিশোধ মানুষকে অতীতের সঙ্গে বেঁধে রাখে; আর নীরবতা মানুষকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়। যে চলে গেছে, তাকে যেতে দিতে হয়। যে ভুল বুঝেছে, তাকে তার ভুলের মধ্যেই থাকতে দিতে হয়। যে আমার মূল্য বোঝেনি, তাকে আমার মূল্য বোঝানোর দায়িত্বও আমার নয়। আমার দায়িত্ব শুধু একটাই—অন্যের আচরণ যেন আমাকে আমার নিজের কাছেই ছোট করে না দেয়।

জীবনের দীর্ঘ পথচলায় এখন মনে হয়, মানুষ হারানো সবসময় ক্ষতি নয়। কিছু মানুষ চলে যাওয়ার পর যে শূন্যতা তৈরি হয়, সময়ের সঙ্গে কখনো কখনো সেই শূন্যতার মধ্যেই শান্তির জায়গা তৈরি হয়। কিছু সম্পর্ককে ধরে রাখার চেয়ে ছেড়ে দেওয়া বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। কারণ জীবন শুধু মানুষ ধরে রাখার নাম নয়; কখন কোথায় থামতে হবে, কোথায় নিজেকে রক্ষা করতে হবে, আর কোথায় নীরবে সরে আসতে হবে—সেটিও জীবনের বড় শিক্ষা।

তাই আঘাতকে অভিশাপ বানাব না; অভিজ্ঞতা বানাব। বিশ্বাস ভাঙাকে নিজের চরিত্র ভাঙার কারণ হতে দেব না। কেউ আমার ভালো কাজের মূল্য না দিলেও আমার ভালোত্বকে সস্তা ভাবব না। কারণ আমার মানবিকতার মূল্য অন্যের কৃতজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে না। মানুষ আমাকে কীভাবে মূল্যায়ন করল, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো—আমি আমার বিবেকের কাছে কেমন থাকলাম।

দুনিয়ার জীবনে মানুষ মানুষের কাছে অনেক হিসাব রাখে। কে কতটা দিল, কে কতটা নিল, কে পাশে ছিল, কে মুখ ফিরিয়ে নিল—এসব হিসাব হয়তো মানুষ ভুলে যেতে পারে। কিন্তু মানুষের কাজের হিসাব আল্লাহর কাছে অদৃশ্য থাকে না। তাই কারও প্রতি অন্যায় করে, কারও হক নষ্ট করে, কিংবা কারও কষ্টের কারণ হয়ে নিজের কাছে নির্দোষ থাকার চেষ্টা করে কোনো লাভ নেই। দুনিয়ার বিচার এড়িয়ে যাওয়া গেলেও আখিরাতের জবাবদিহি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

এই বিশ্বাসই আমাকে একটি কথা শিখিয়েছে—অন্যের অন্যায়ের জবাব নিজের অন্যায় দিয়ে দেওয়া যাবে না। কেউ আমার সঙ্গে অন্যায় করেছে বলে আমিও তার সঙ্গে অন্যায় করব—এটি ন্যায়বিচার নয়। বরং নিজের কষ্টকে সংযমে ধারণ করে, নিজের অধিকারটুকু রক্ষা করে এবং আল্লাহর ওপর বিচার ছেড়ে দেওয়ার মধ্যেই কখনো কখনো মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি লুকিয়ে থাকে। ক্ষমা সবসময় দুর্বলতার পরিচয় নয়; আবার ক্ষমা মানে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়াও নয়। কিছু মানুষকে ক্ষমা করে দূরে রাখা যায়, আর কিছু সম্পর্ককে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে সামনে এগিয়ে যাওয়া যায়।

শেষ পর্যন্ত মানুষ কতজনকে নিজের করে পেয়েছে, সেই হিসাবই সবচেয়ে বড় নয়। বড় হলো—এই দীর্ঘ জীবনে সে কতটা সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠতে পেরেছে। কতজনের বিপদের দিনে পাশে দাঁড়িয়েছে, কতজনকে অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার পথ দেখিয়েছে, কত আঘাত পেয়েও নিজের ভেতরের মানবিকতাকে বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছে—সেই হিসাবই একদিন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ মানুষের কাছে পাওয়া সম্মান ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, কিন্তু বিবেকের কাছে নিজের অবস্থান এবং আল্লাহর কাছে নিজের আমলের হিসাবই শেষ পর্যন্ত মানুষের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণ করবে।

একদিন হয়তো সব সম্পর্কের হিসাব মুছে যাবে। কে কাছে ছিল, কে দূরে সরে গিয়েছিল, কে হাত ধরেছিল, কে সেই হাত ছেড়ে দিয়েছিল—সবই সময়ের সঙ্গে অতীত হয়ে যাবে। কিন্তু নিজের বিবেকের কাছে করা হিসাবটি থেকে যাবে। সেদিন হয়তো প্রশ্ন হবে না—কে আমাকে কতটা ভালোবাসল, কে আমার কতটা আপন ছিল, কিংবা কে আমাকে কতটা কষ্ট দিল।

প্রশ্ন হবে আরও গভীর—

আমি কি অন্যের আচরণে বদলে গিয়ে নিজেকেও হারিয়ে ফেলেছিলাম, নাকি সমস্ত আঘাতের পরও মানুষ হয়ে বেঁচে থাকার আমানতটুকু রক্ষা করতে পেরেছিলাম?

শেষ পর্যন্ত মানুষ চেনার সবচেয়ে বড় মূল্য হয়তো এখানেই—অন্যকে চিনতে গিয়ে যেন নিজের মানুষটাকেই হারিয়ে না ফেলি; আর মানুষের দেওয়া আঘাতে যেন আল্লাহর দেওয়া মানবিকতাটুকু হারিয়ে না ফেলি।

-মোঃ শহীদুল ইসলাম
সাংবাদিক ও কলাম লেখক

Share this news as a Photo Card


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

আরো সংবাদ
19 September 2026

মানুষ চেনার মূল্য

www.promothalo.com
19 September 2026

মানুষ চেনার মূল্য

www.promothalo.com