শাহ লাভলী রহমান
বাবা, তুমি চলে গেলে নীরবে
যেমন সন্ধ্যার শেষে, একটি পাখি ডানা গুটিয়ে
অচেনা আকাশের ওপারে হারিয়ে যায়,
পেছনে রেখে যায় শুধু, খালি বাসার উষ্ণতা।
তুমি চলে গেলে, এই স্বার্থের পৃথিবীর ভিড় থেকে
নিজের কাঁধে করে নিয়ে গেলে
তোমার সারাজীবনের অর্জন
একটি নির্মল নাম, কিছু মানুষের শ্রদ্ধা,
আর সন্তানের চোখে, অমোচনীয় এক শূন্যতা।
আমি রয়ে গেলাম, বাবা
নিজের ছায়ার কাছেই অপরাধী হয়ে।
তোমার শেষ বিকেলের পাশে
যে হাতটি রাখা হয়নি, যে কথাটি বলা হয়নি,
যে ঋণটি শোধ করার আগেই
সময় তার দরজা বন্ধ করে দিল
সেইসব না-বলা কথার ভার
আজ আমার বুকের ভেতর পাথর হয়ে আছে।
বাবা, জীবন বড় নিষ্ঠুর এক নদী
যাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি,
তাকেই একদিন, নদীর ওপারে রেখে
একা ফিরতে হয়।
তোমাকে কতটুকুই বা দেখেছি!
অথচ তোমার ছায়াতেই
আমার শৈশবের দুপুরগুলো নিরাপদ ছিল।
তখন বুঝিনি? বাবা নামের একটি গাছের নিচে
দাঁড়িয়ে থাকা মানেই
পৃথিবীর সমস্ত ঝড় থেকে বেঁচে থাকা।
আজ সেই গাছ নেই, আছে শুধু তার ছায়ার স্মৃতি।
আমি তোমার জন্য, কিছুই করতে পারি নি, বাবা
শুধু দুহাত তুলে, নিঃশব্দ আকাশের দিকে তাকিয়ে বলি,
হে আল্লাহ, আমার বাবার সমস্ত ভুলত্রুটি ক্ষমা করো,
তাঁর কবরকে নূরের বাগান করে দাও,
তাঁর নিঃসঙ্গ অন্ধকারে, রহমতের আলো জ্বেলে দাও।
জান্নাতুল ফেরদৌসের দরজা, তাঁর জন্য প্রশস্ত করে দাও।
তুমি বেঁচে থাকলে হয়তো, তোমার দুটো কথায়
অশান্ত ঘর শান্ত হতো, তোমার উপস্থিতিই হয়তো
আমাদের এলোমেলো দিনগুলোকে, আবার গুছিয়ে দিত।
কিন্তু সময়, সে তার মতো চলে যায়, আর যাওয়ার পথে
কিছু মানুষকে নিয়ে যায়, আমাদের পৃথিবী থেকে।
তুমি চলে গেলে, বাবা, তোমার ঘরটি রয়ে গেল,
তোমার ব্যবহৃত জিনিসগুলো রয়ে গেল,
দরজার পাশে হয়তো, তোমার অপেক্ষার স্মৃতিও রয়ে গেল
শুধু তুমি নেই।
কখনো কখনো মনে হয়, দরজাটা খুলবে,
তুমি ফিরে এসে বলবে, কী রে, এত চুপচাপ কেন?”
কিন্তু দরজা খোলে, বাতাস ঢোকে,
পর্দা নড়ে, তুমি আর আসো না।
বাবা, হয়তো একদিন আমাকেও, এই নশ্বর নীড় ছেড়ে, অচেনা আকাশের পথে হাঁটতে হবে।
সেদিন যদি তোমার সঙ্গে দেখা হয়,
আমার দিকে তাকিয়ে, লজ্জা দিও না বাবা
বলবে শুধু, “দেরি করেছিস,
তবুও এসেছিস, চল, এবার আর কোথাও যাব না।”
তার আগে পর্যন্ত, তুমি থেকো আমার দোয়ায়,
আমি থাকি তোমার স্মৃতির ভেতর।
পৃথিবী তোমাকে হারিয়েছে, বাবা
কিন্তু আমি জানি, কিছু মানুষ চলে গেলেও
তারা কখনো চলে যায় না।
তারা থেকে যায়, সন্তানের দীর্ঘশ্বাসে,
রাতের নীরবতায়, একটি পুরোনো ছবির চোখে,
আর নামাজ শেষে, দুই হাতের মাঝখানে
নীরবে কাঁপতে থাকা, একটি নাম হয়ে।
বাবা, তুমি চলে গেলে নীরবে,
কিন্তু তোমার শূন্যতা
আমার জীবনে
সারাজীবন শব্দ করে যাবে।