
মস্তিষ্কের গভীরে থাকা অস্বাভাবিক শক্ত একটি টিউমার। অস্ত্রোপচারও এগোচ্ছিল পরিকল্পনা অনুযায়ী। কিন্তু প্রায় ৭০ শতাংশ টিউমার অপসারণের পরই ঘটে অপ্রত্যাশিত ঘটনা—হঠাৎ ফুলে উঠতে শুরু করে রোগীর মস্তিষ্ক। একের পর এক জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছিল না। এমনকি জীবনরক্ষাকারী অস্ত্রোপচারের জন্য ব্যবহৃত দুটি ক্র্যানিওটোমও কাজ করা বন্ধ করে দেয়। সংকটের সেই মুহূর্তে চিকিৎসক দলের নিরলস প্রচেষ্টা, ধৈর্য এবং সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা মিলেই শেষ পর্যন্ত ফিরে আসে আশার আলো।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোস্পাইন ও নিউরোসার্জারি বিভাগের বিশেষজ্ঞ ডা. মো. ইসমে আজম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করা এক পোস্টে এই রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন।
তিনি জানান, রোগীর ফ্যালকোটেন্টোরিয়াল মেনিনজিওমা অপসারণের জন্য অস্ত্রোপচার শুরু করা হয়। সাধারণত ব্রেইন টিউমার তুলনামূলক নরম হলেও এই টিউমারটি ছিল অত্যন্ত শক্ত এবং মস্তিষ্কের গভীর অংশে অবস্থান করায় সাকশন মেশিন দিয়ে অপসারণ সম্ভব হচ্ছিল না। ফলে একাধিক সার্জিক্যাল ব্লেড ব্যবহার করে ধাপে ধাপে টিউমার কেটে বের করতে হয়।
অস্ত্রোপচারের একপর্যায়ে প্রায় ৭০ শতাংশ টিউমার অপসারণের পর মস্তিষ্ক ফুলে যেতে শুরু করে। সঙ্গে সঙ্গে অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট ডা. তানজিল হাসান রোগীর অবস্থা মূল্যায়ন করেন। এবিজি (ABG) পরীক্ষায় কার্বন ডাই-অক্সাইড জমে থাকার কোনো সমস্যা ধরা পড়েনি। এরপর ম্যানিটল প্রয়োগ, মাথা উঁচু করে রাখা, হাইপারভেন্টিলেশনসহ বিভিন্ন জরুরি চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করা হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছিল না।
পরিস্থিতি সামাল দিতে চিকিৎসকরা মস্তিষ্কের পাশ দিয়ে সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড (CSF) এবং জমাট বাঁধা রক্ত বের করার চেষ্টা করেন। পরে ডিকমপ্রেসিভ ক্র্যানিয়েকটমির সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও ব্যবহৃত দুটি ক্র্যানিওটোমই কাজ না করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
ডা. ইসমে আজম লিখেছেন, সেই অসহায় মুহূর্তে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। সারারাত চেষ্টার পর ভোরে রোগীকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। ফজরের নামাজ শেষে তিনি রোগীর সুস্থতার জন্য দোয়া করেন। ঘুম থেকে উঠে আইসিইউতে ফোন করতেই জানতে পারেন, রোগীর অবস্থার উন্নতি হয়েছে।
কয়েক দিনের নিবিড় চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের পর রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পান। নিজের অনুভূতি জানিয়ে চিকিৎসক পোস্টের শেষে লেখেন, “আজ সেই রোগীকে ছুটি দিলাম। আলহামদুলিল্লাহ।”
চিকিৎসকদের মতে, মস্তিষ্কের গভীরে থাকা এ ধরনের টিউমারের অস্ত্রোপচার অত্যন্ত জটিল। এমন পরিস্থিতি সফলভাবে মোকাবিলায় নিউরোসার্জন, অ্যানেস্থেসিয়া ও আইসিইউ দলের সমন্বিত দক্ষতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণই রোগীকে নতুন জীবন ফিরিয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।