বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২২ পূর্বাহ্ন

শারদীয় দুর্গোৎসবে সম্প্রীতির প্রত্যয় শ্রীমঙ্গলের দিঘাপাড়ায় দুর্গাবাড়ীকে ঘিরে ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতি

প্রমথ আলো / ৮৩ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
প্রকাশিত হয়েছেঃ বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক: মোঃ জালাল উদ্দিন।
চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য সুপরিচিত। সবুজ চা-বাগান, পাহাড়-টিলা ও বৈচিত্র্যময় জনপদের এই উপজেলায় শারদীয় দুর্গোৎসব প্রতিবছর ধর্মীয় আবেগ, ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য আবহ তৈরি করে।
এরই ধারাবাহিকতায় শ্রীমঙ্গল উপজেলার দিঘাপাড়া (মতিগঞ্জ বাজার) এলাকায় অবস্থিত দিঘাপাড়া সার্বজনীন শ্রীশ্রী দুর্গাবাড়ী পূজা উদ্‌যাপন কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন পুলিন সরকার এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সমরাজ মজুমদার। এ পূজামণ্ডপকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে থাকে।
কমিটির উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ডা. যতীন্দ্র মজুমদার লিটন ধর্মীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণ, সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির প্রতীক দুর্গোৎসব

দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। তবে এর আনন্দ ও উৎসবমুখর পরিবেশ ধর্মীয় গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর সমাজেও ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও সৌহার্দ্য এ উৎসবকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।
দিঘাপাড়া সার্বজনীন শ্রীশ্রী দুর্গাবাড়ী পূজা উদ্‌যাপন কমিটিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করে থাকেন। পূজামণ্ডপটি এলাকার ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সামাজিক বন্ধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

সম্প্রীতি ও ঐক্যের আহ্বান ডা. যতীন্দ্র মজুমদার লিটনের

দিঘাপাড়া সার্বজনীন শ্রীশ্রী দুর্গাবাড়ী পূজা উদ্‌যাপন কমিটির উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ডা. যতীন্দ্র মজুমদার লিটন বলেন, “শারদীয় দুর্গোৎসব আমাদের ধর্মীয় ঐতিহ্য, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য প্রতীক। এ উৎসব মানুষের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধাবোধ ও সৌহার্দ্য জাগ্রত করে। আমরা চাই, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মিলেমিশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎসব উদ্‌যাপন করুক।”
তিনি আরও বলেন, “দিঘাপাড়া সার্বজনীন শ্রীশ্রী দুর্গাবাড়ী পূজা উদ্‌যাপন কমিটির মাধ্যমে ধর্মীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতি ও ঐক্য আরও সুদৃঢ় হোক। সবার সম্মিলিত সহযোগিতায় এ অঞ্চলে শান্তি, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন অটুট থাকবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”

বিজয়া দশমীতে শ্রীমঙ্গলে বর্ণিল শোভাযাত্রা

বুধবার (২১ অক্টোবর) বিজয়া দশমী উপলক্ষে শ্রীমঙ্গল শহরের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ থেকে প্রতিমা নিয়ে বর্ণিল শোভাযাত্রা বের করা হয়। দুপুর ২টায় মৌলভীবাজার সড়কে অবস্থিত শ্রীশ্রী সার্বজনীন দুর্গাবাড়ীর সামনে থেকে শোভাযাত্রাটি শুরু হয়। এতে প্রায় ৬০টি ট্রাকে প্রতিমা বহন করা হয় এবং অংশ নেন হাজারো মানুষ।
শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণকালে ঢাকের বাদ্য, প্রতিমার বর্ণিল সাজ ও মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। শ্রীমঙ্গল শহরের পাশাপাশি আশপাশের গ্রামাঞ্চল ও বিভিন্ন চা-বাগানের পূজামণ্ডপ থেকেও প্রতিমা নিয়ে শোভাযাত্রায় যোগ দেন পূজারিরা।
শোভাযাত্রাটি চৌমুহনা, কলেজ রোড, গুহ রোড, ভানুগাছ রোড ও স্টেশন রোড প্রদক্ষিণ করে পুনরায় চৌমুহনা হয়ে হবিগঞ্জ সড়কে জগন্নাথদেবের আখড়ার সামনে যায়। পরে প্রতিমাগুলো নিজ নিজ মণ্ডপে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

সিঁদুর খেলা ও বিদায়ের আবেগ

বিজয়া দশমী দুর্গোৎসবের শেষ দিন। এদিন প্রতিমা বিসর্জনের আগে বিভিন্ন পূজামণ্ডপে দেবীবরণ ও সিঁদুর খেলার আয়োজন করা হয়। বিবাহিত নারীরা দেবী দুর্গার চরণে সিঁদুর নিবেদন করেন এবং পরস্পরের কপাল ও সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
আনন্দের পাশাপাশি দেবীকে বিদায় জানানোর মুহূর্তে অনেকের মধ্যে দেখা যায় আবেগ ও বিষাদের ছাপ। বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় আচার নয়; এটি ঘরের মেয়ের বাবার বাড়িতে আগমন এবং কয়েক দিনের আনন্দ শেষে ফিরে যাওয়ার আবেগঘন অনুভূতির সঙ্গেও জড়িত।
সিঁদুর খেলার এই ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সৌভাগ্য, মঙ্গল, পারিবারিক বন্ধন ও কল্যাণের প্রত্যাশা। দেবীকে বিদায় জানানোর সময় ভক্তরা প্রার্থনা করেন, সবার জীবনে শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ নেমে আসুক।

শ্রীমঙ্গলের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও উৎসবের আমেজ

শ্রীমঙ্গল শুধু চা-বাগান ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই পরিচিত নয়; বিভিন্ন ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সহাবস্থানও এ অঞ্চলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনযাপনের সমন্বয়ে শ্রীমঙ্গল দেশের একটি স্বতন্ত্র জনপদ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
দুর্গাপূজাকে ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকার দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে পূজামণ্ডপগুলো উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। প্রতিমা দর্শন, আলোকসজ্জা, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও শোভাযাত্রা উপভোগ করতে ভিড় করেন নানা বয়সের মানুষ।
এ ধরনের উৎসব মানুষের মধ্যে পারস্পরিক পরিচিতি, সহযোগিতা ও সামাজিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করতে ভূমিকা রাখে। ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি শ্রীমঙ্গলের বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক পরিচয়ও এতে প্রতিফলিত হয়।

নিরাপত্তা ও সুশৃঙ্খল আয়োজন

বিজয়া শোভাযাত্রাকে নির্বিঘ্ন রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। বিভিন্ন পূজামণ্ডপে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। শোভাযাত্রার নিরাপত্তা তদারকিতে ড্রোন ব্যবহারের পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন বলে প্রাপ্ত বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ধর্মীয় উৎসব উদ্‌যাপন এবং সব সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এমন আয়োজনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।

সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে শেষ হলো দুর্গোৎসব

বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। কয়েক দিনের পূজা, প্রার্থনা ও আনন্দ শেষে ভক্তদের মনে থেকে যায় মা দুর্গার আবার ফিরে আসার প্রত্যাশা।
শ্রীমঙ্গলের দুর্গোৎসবের এই আয়োজন ধর্মীয় ঐতিহ্য, সামাজিক বন্ধন ও পারস্পরিক সম্প্রীতির গুরুত্ব তুলে ধরে। দিঘাপাড়া সার্বজনীন শ্রীশ্রী দুর্গাবাড়ী পূজা উদ্‌যাপন কমিটিসহ এলাকার ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগে সম্প্রীতির এই বন্ধন আরও সুদৃঢ় হবে—এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের।

Share this news as a Photo Card


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

আরো সংবাদ

21 October 2026

শারদীয় দুর্গোৎসবে সম্প্রীতির প্রত্যয় শ্রীমঙ্গলের দিঘাপাড়ায় দুর্গাবাড়ীকে ঘিরে ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতি

www.promothalo.com
21 October 2026

শারদীয় দুর্গোৎসবে সম্প্রীতির প্রত্যয় শ্রীমঙ্গলের দিঘাপাড়ায় দুর্গাবাড়ীকে ঘিরে ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতি

www.promothalo.com