নিজস্ব প্রতিবেদক রাজশাহীঃ
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ৬ নম্বর মাটিকাটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা যুবলীগ নেতা এবং রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এ.এইচ.এম. খায়রুজ্জামান লিটনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত মো. সোহেল রানার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম, দুর্নীতি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এসব অভিযোগ নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। এলাকাবাসী অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সোহেল রানা আওয়ামী লীগের সাবেক মেয়র এ.এইচ.এম. খায়রুজ্জামান লিটনের পাশাপাশি সাবেক সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরী, আসাদুজ্জামান আসাদ, সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ও সাবেক সংসদ সদস্য আইনউদ্দিনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁদের রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে তিনি এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রশাসনের সহযোগিতায় ভোটকেন্দ্র দখল, জাল ভোট ও বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি তদন্ত করা হলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে। সোহেল রানা রাজশাহীতে তার ভাড়া বাসাতেও নারি নিয়ে ধরা পড়েছেন এবং প্রশাসনের সহযোগিতায় লুঙ্গি পরেই পালিয়ে গেছে বলে যানান স্থানীয়রা।

এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি ও আন্দোলনের সময় বিরোধী মতের নেতাকর্মীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, হামলা এবং এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টির অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের একতরফা জাতীয় নির্বাচনে বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র দখল, বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, দলীয় কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনাতেও তাঁর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। ছাত্র আন্দলোনের সময় সোহেল রানা গোদাগাড়ী উপজেলা ছাত্রদের উপর এবং রাজশাহী শহরেও ছাত্রছাত্রীদের ওপর নৃশংস ভাবে হামলা চালিয়েছেন। ছাত্রছাত্রীদের আন্দলোনের সময় তিনি বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের অনেক নেতা আত্মগোপনে থাকলেও সোহেল রানা এখনো প্রকাশ্যে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন এবং রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় রয়েছেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা, জেলা ও স্থানীয় পর্যায়ের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার সহযোগিতার কারণেই তিনি এখনো চেয়ারম্যান হিসেবে বহাল রয়েছেন।

সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নিয়েও চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বয়স্ক, বিধবা ও মাতৃত্বকালীন ভাতার কার্ড করে দেওয়ার নামে অনেকের কাছ থেকে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হলেও অনেকেই পরে কোনো সুবিধা পাননি। এছাড়া টিসিবির পণ্য, সরকারি চাল বিতরণ এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগও তুলেছেন তারা।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, ইউনিয়ন পরিষদে সেবা নিতে গিয়ে অনেকেই দুর্ব্যবহার ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। প্রতিবাদ করলে হুমকি দেওয়া হতো বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।

এদিকে সোহেল রানার সম্পদ বৃদ্ধির বিষয়েও নানা প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, একসময় বসতভিটা ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো সম্পদ না থাকলেও বর্তমানে তিনি বিপুল পরিমাণ জমি, পুকুর, ইটভাটা, গরুর খামার এবং রাজশাহী শহরে একাধিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মালিক সোহেল রানা। সোহেল রানা গোদাগাড়ী উপজেলার শীর্ষ হেরোইন ব্যাবসায়ীক এবং মাদক সিন্ডিকেটের গডফাদার। তাকে দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্ত মুলক শাস্তি দাবি করেছেন গোদাগাড়ী উপজেলার সাধারণ জনগণ।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, মাটিকাটা ইউনিয়নের জামদানি মোড় এলাকায় আবির ইটভাটা তাঁর নিজস্ব অর্থায়নে, এবং সেখানে প্রায় ৫ বিঘা জমি ক্রয় করেছেন। এছাড়া গোগ্রাম ইউনিয়নে প্রায় ৩৯ বিঘা জমির ওপর পুকুর ও একটি বড় গরুর খামার রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হচ্ছে। রাজশাহী নিউ মার্কেটে তিনটি এবং থিম ওমর প্লাজায় দুটি দোকানের মালিকানার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, অতীতে তাঁর বিরুদ্ধে মাদক-সংক্রান্ত মামলার অভিযোগ ছিল এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি দ্রুত সম্পদের মালিক হয়েছেন।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, সীমিত আর্থিক সামর্থ্যের একজন ব্যক্তি কীভাবে অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হলেন। তারা তাঁর সম্পদের উৎস, আয়কর নথি, জমির দলিল, ব্যবসার বৈধতা এবং ঘোষিত আয়ের সঙ্গে বর্তমান সম্পদের সামঞ্জস্য তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, গত ২৩ জুন ২০২৬ রাতে নিজ বাড়িতে সীমিত পরিসরে আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কেক কেটে অনুষ্ঠানও পালন করেন সোহেল রানা। বিষয়টি নিয়েও এলাকায় আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

এ বিষয়ে এলাকাবাসী বলেন, সোহেল রানার বিরুদ্ধে উত্থাপিত সব অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করা হোক। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রয়োজন হলে গ্রেফতারের দাবি জানান তারা।