
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের মতপ্রকাশ, তথ্য আদান-প্রদান ও জনসচেতনতা তৈরির গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু সেই মাধ্যম যখন ব্যক্তিগত আক্রোশ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, গুজব, চরিত্রহনন কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচারের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তা শুধু একজন ব্যক্তির ক্ষতি করে না; এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পরিবার, সমাজ এমনকি স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরও।
ফেনীর দাগনভূঞায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেন্দ্র করে এমন প্রবণতা দিন দিন উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। ব্যক্তিগত বিরোধ, রাজনৈতিক মতপার্থক্য কিংবা স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে যাচাই-বাছাইহীন অভিযোগ, বিভ্রান্তিকর তথ্য, ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে এসব কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ছে অসংখ্য মানুষের কাছে। ফলে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য অনেক সময় হারিয়ে যাচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—একটি অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করেই অনেকে সেটিতে মন্তব্য করছেন, শেয়ার করছেন কিংবা নিজেদের ওয়ালে পুনরায় প্রকাশ করছেন। এভাবে একজনের তৈরি করা বিভ্রান্তিকর তথ্য মুহূর্তেই বহু মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। অথচ পরে তথ্যটি মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর প্রমাণিত হলেও যে সামাজিক ক্ষতি হয়ে যায়, তা অনেক সময় আর সহজে পূরণ করা সম্ভব হয় না।
একজন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে আমি মনে করি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কারও ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জায়গা নয়। কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তার জন্য আইনগত ও প্রশাসনিক পথ রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে হেয় করা, সম্মানহানি করা কিংবা জনমনে বিভ্রান্তি ও উত্তেজনা সৃষ্টি করা কোনোভাবেই দায়িত্বশীল আচরণ হতে পারে না।
রাজনৈতিক মতের ভিন্নতা গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক বাস্তবতা। কিন্তু মতের ভিন্নতার কারণে মিথ্যাচার, ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা চরিত্রহনন কোনোভাবেই রাজনৈতিক অধিকারের অংশ হতে পারে না। একইভাবে ব্যক্তিগত বিরোধ থাকলেও তার প্রতিশোধ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেওয়া কিংবা একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিষয়কে জনসম্মুখে এনে তাকে সামাজিকভাবে হেয় করার প্রবণতা পরিহার করা জরুরি।
মনে রাখতে হবে, একটি মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর পোস্ট তৈরি করা যেমন দায়িত্বহীনতা, তেমনি সত্যতা যাচাই না করে সেটি ছড়িয়ে দেওয়াও দায়িত্বশীল নাগরিকের কাজ নয়। একটি শেয়ার, একটি মন্তব্য কিংবা একটি ফরোয়ার্ডও কখনো কখনো একজন মানুষের সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক সম্পর্ক ও পেশাগত জীবনে বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
এ কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। কোনো সংবাদ, অভিযোগ, ছবি বা ভিডিও চোখে পড়লেই তা সত্য ধরে নেওয়া যাবে না। তথ্যের উৎস কী, বিষয়টি কতটা নির্ভরযোগ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য রয়েছে কি না—এসব যাচাই করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
একই সঙ্গে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুজব, মিথ্যা তথ্য, মানহানিকর বক্তব্য ও উসকানিমূলক কনটেন্টের মাধ্যমে যাতে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি না হয়, সেদিকে নজরদারি বাড়ানো জরুরি। তবে এ ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি নিরপরাধ মানুষের মতপ্রকাশের অধিকার ও ন্যায়সংগত সমালোচনার অধিকারও যেন যথাযথভাবে সুরক্ষিত থাকে—সেদিকেও খেয়াল রাখা দরকার।
আমাদের মনে রাখতে হবে, আজ যে মানুষটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারের শিকার হচ্ছেন, আগামীকাল সেই জায়গায় যে কেউ থাকতে পারেন। একটি মিথ্যা তথ্য যখন ছড়িয়ে পড়ে, তখন তার আঘাত শুধু একজনের ওপর পড়ে না; ধীরে ধীরে তা সমাজের পারস্পরিক বিশ্বাস ও সহনশীলতাকেও দুর্বল করে।
তাই এখনই সময় সামাজিকভাবে এই প্রবণতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর। অপপ্রচারকে উৎসাহ নয়, প্রত্যাখ্যান করতে হবে। যাচাই ছাড়া কোনো তথ্য শেয়ার না করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচার না করে যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়ার আশ্রয় নিতে হবে।
দাগনভূঞার মানুষ গুজব, অপপ্রচার কিংবা চরিত্রহননের রাজনীতি চায় না। তারা চায় সত্যনিষ্ঠ তথ্য, পারস্পরিক সম্মান, শান্তিপূর্ণ সামাজিক পরিবেশ এবং আইনের শাসন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের শক্তি হতে পারে—যদি আমরা এটিকে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করি। তাই আসুন, ফেসবুককে প্রতিহিংসার অস্ত্র না বানিয়ে সত্য, সচেতনতা ও জনকল্যাণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করি।
অপপ্রচার নয়—তথ্য হোক যাচাই করা।
বিদ্বেষ নয়—প্রাধান্য পাক সত্য ও দায়িত্বশীলতা।
চরিত্রহনন নয়—প্রতিষ্ঠিত হোক আইনের পথ।
এখনই সময়—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সচেতনভাবে রুখে দাঁড়ানোর।
—একজন সচেতন নাগরিক ও গণমাধ্যমকর্মী
প্রকাশক ও সম্পাদক সোহেল সরকার কর্তৃক লন্ডন যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
সহ সম্পাদকঃ শেখ ফরিদ হোসেন বার্তা সম্পাদকঃ জিয়াউল ইসলাম জিয়া
WhatsApp 00447798833284 (United Kingdom)
ইমেইলঃ promothalo.com@gmail.com
Copyright © 2026 প্রমথ আলো । বাংলা নিউজ পেপার. All rights reserved.