প্রিন্ট এর তারিখঃ জুন ১২, ২০২৬, ৪:০১ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ মে ২৮, ২০২৬, ১১:৩৫ পি.এম
জঙ্গল সলিমপুরে ‘ইয়াসিন-ফারুক সাম্রাজ্য’! পাহাড়ের গুহায় অস্ত্র কারখানা, প্রশাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতির অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চল ও জঙ্গল সলিমপুরকে ঘিরে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের মাঝে। বান্দরবানের রুমা ও থানচিতে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) তথা ইয়াসিন বাহিনীর অতর্কিত হামলার ঘটনার পর পাহাড়ি অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর শক্তি, নেটওয়ার্ক ও তৎপরতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। একই সময়ে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় ইয়াসিন ও ফারুক বাহিনীকে ঘিরে বিস্ফোরক সব অভিযোগ সামনে আনছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
মঙ্গলবার (২৬ মে) সকালে রাজধানীর জাতীয় ঈদগাহ ময়দানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে র্যাব মহাপরিচালক ও অতিরিক্ত আইজিপি মো. আহসান হাবীব পলাশ পাহাড়ে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় র্যাবের কিছু অসাবধানতা ও গোয়েন্দা নজরদারির দুর্বলতার কথা অকপটে স্বীকার করেন। তিনি বলেন, “তারা অতর্কিতভাবে হামলা করেছে। আমাদেরও কিছু অসাবধানতা ছিল। হয়তো আমরা তাদের কার্যক্রম সেই মাত্রায় মনিটরিং করতে পারিনি।
র্যাব ডিজি আরও বলেন, পাহাড়ে নতুন একটি ক্যাম্প স্থাপন করে স্থায়ীভাবে অবস্থান নেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল। সেই অপ্রস্তুত ক্যাম্পকে লক্ষ্য করেই হামলা চালানো হয়। তবে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “আমাদের পরাস্ত করার মতো শক্তি তাদের নেই। তারা আমাদের অসাবধানতার সুযোগ নিয়েছে মাত্র। কিন্তু তারা আর পার পাবে না। পাহাড় থেকে তাদের সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করা হবে।”
র্যাব সূত্রে জানা গেছে, হামলার পর থেকে যৌথবাহিনীর অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত অন্তত ৩০ জন সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন র্যাব প্রধান। পাহাড়ি এলাকায় নতুন করে নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলার কাজও চলছে।
এদিকে রুমা-থানচির ঘটনায় যখন সারাদেশে উদ্বেগ বাড়ছে, ঠিক তখনই চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় ইয়াসিন ও ফারুক বাহিনীর ভয়ঙ্কর কার্যক্রম নিয়ে একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ তুলছেন এলাকাবাসী। স্থানীয়দের দাবি, পাহাড়ি গুহাগুলোকে গোপন অস্ত্র কারখানায় রূপান্তর করা হয়েছে। সেখানে দেশীয় অস্ত্র তৈরি থেকে শুরু করে আগ্নেয়াস্ত্র মজুদের কাজ চলছে প্রকাশ্যেই।
অভিযোগ রয়েছে, সন্ত্রাসী ফারুকের কাছে একে-৪৭সহ অত্যাধুনিক বিভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। এছাড়া ইয়াসিন ও ফারুক বাহিনীর সদস্যরা প্রশাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার হুমকি দিয়ে এলাকায় আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। কথায় কথায় তারা বলে, “প্রশাসন গুনার টাইম নেই।” এসব বক্তব্য সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম ভীতি তৈরি করেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, সরকারি পাহাড় ও কেও প্লট অবৈধভাবে দখল ও বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এই চক্র। সেই টাকায় গড়ে উঠেছে বিশাল অস্ত্র নেটওয়ার্ক, সন্ত্রাসী বাহিনী এবং পাহাড়জুড়ে প্রভাব বলয়। এলাকাবাসীর অভিযোগ, বহু বছর ধরে এই বাহিনী পাহাড়ি অঞ্চলে একপ্রকার সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা চালিয়ে যাচ্ছে।
৪২ মামলার আসামি ইয়াসিনকে ঘিরে এলাকায় রয়েছে চরম আতঙ্ক। তার বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, ভূমিদখল, অস্ত্র ব্যবসা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের। একইভাবে টপ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত ফারুকের বিরুদ্ধেও রয়েছে একাধিক গুরুতর অভিযোগ। এলাকাবাসীর দাবি, তাদের বাহিনীর সদস্যরা প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে চলাফেরা করলেও রহস্যজনক কারণে বারবার ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
আরও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ হলো, ফারুক বাহিনীর হয়ে কাজ করছে চট্টগ্রাম নগরীর কয়েকজন কথিত ভুয়া সাংবাদিক। স্থানীয়দের দাবি, এসব ব্যক্তি বিভিন্ন প্রশাসনিক দপ্তরের তথ্য সংগ্রহ করে সন্ত্রাসীদের কাছে পৌঁছে দেয়। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালানোর আগেই সন্ত্রাসীরা নিরাপদ আশ্রয়ে সরে পড়ে।
অভিযোগ রয়েছে, ইয়াসিন, ফারুক ও রিপন বাহিনীর বিরুদ্ধে একাধিক মানুষকে হত্যা করে আলীনগরের বিভিন্ন স্থানে মাটি চাপা দিয়ে রাখার ঘটনাও ঘটেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা প্রশাসনের কোনো প্রকাশ্য বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জঙ্গল সলিমপুরের সাধারণ মানুষ বলছেন, পুরো এলাকাজুড়ে এক ধরনের অঘোষিত সন্ত্রাসী শাসন চলছে। দোকানপাট, পরিবহন, পাহাড়ি জমি, নির্মাণকাজ, সবকিছুতেই চাঁদাবাজি ও নিয়ন্ত্রণ করছে এই বাহিনী। স্থানীয়দের দাবি, এলাকার প্রায় ৮০ শতাংশ দোকানদার কোনো না কোনোভাবে ইয়াসিন-ফারুক বাহিনীর সোর্স হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। কেউ অস্বীকার করলে তাকে মারধর, গুম কিংবা হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা জানান, সন্ধ্যার পর সাধারণ মানুষ ভয়ে ঘর থেকে বের হতে পারেন না। পাহাড়ি এলাকাগুলো রাতের বেলায় পরিণত হয় সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে। মাঝরাতে অস্ত্রের মহড়া, মোটরসাইকেল শোডাউন ও গোপন বৈঠক নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে দাবি করেন তারা।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন, প্রশাসনের লোক দেখানো অভিযান আর কতদিন চলবে? পাহাড়ে একের পর এক সন্ত্রাসী বাহিনীর উত্থান, অস্ত্র কারখানা, গুম-খুন ও দখলবাজির অভিযোগের পরও কেন স্থায়ী সমাধান আসছে না? সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই কঠোর, দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত অভিযান প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি অঞ্চলে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর অর্থের উৎস, অস্ত্রের সরবরাহ ও গোপন নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে না পারলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। একইসঙ্গে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।
প্রকাশক ও সম্পাদক সোহেল সরকার কর্তৃক লন্ডন যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
সহ সম্পাদকঃ শেখ ফরিদ হোসেন বার্তা সম্পাদকঃ জিয়াউল ইসলাম জিয়া
WhatsApp 00447798833284 (United Kingdom)
ইমেইলঃ promothalo.com@gmail.com
Copyright © 2026 প্রমথ আলো । বাংলা নিউজ পেপার. All rights reserved.