
পিতার বিচারে ভুল হলে সন্তান কখনো সুনাগরিকে পরিণত হতে পারে না। সাম্প্রতিক দুটি ঘটনা আমাদের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। ২০২৩ সালের মার্চে বগুড়া সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষ ঝাড়ু দেওয়াকে কেন্দ্র করে এক বিচারকের কন্যার সঙ্গে সহপাঠীদের সামান্য বচসা হয়। সেই তুচ্ছ ঘটনায় উক্ত বিচারক বিদ্যালয়ে এসে অভিভাবকদের জেলের ভয় দেখিয়ে নিজের পা ধরতে বাধ্য করেন।
এর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসে। দ্বিতীয় ঘটনাটি উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের। সেখানে এক ছাত্রের পক্ষ নিয়ে তার বিচারক পিতা শিক্ষক দয়াল স্যারকে নিজের বাসায় ডেকে চরম হেনস্তা করেন এবং ছাত্রের পা ধরে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেন। এ ঘটনায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। একজন শিক্ষক হিসেবে এ ধরনের পুনরাবৃত্তিমূলক ঘটনায় আমি আজ ম্রিয়মাণ, লজ্জিত ও ব্যথিত।
ব্যক্তিগতভাবে আমার অনেক আত্মীয়, বন্ধু ও ছাত্র বিচারক হিসেবে কর্মরত আছেন। এমনকি অনেক বিচারকের পিতা ছিলেন মহানুভব শিক্ষক। ফলে শিক্ষক ও বিচারকদের মধ্যে একটি ঐতিহ্যগত শ্রদ্ধার সম্পর্ক বিদ্যমান। কোনো ব্যক্তির ভুলের দায়ভার গোটা বিচার বিভাগের নয়। তবে সন্তানের প্রতি একজন বিচারক বা পিতার আচরণ কেমন হওয়া উচিত, তা আমি আমার জীবন থেকে শিখেছি। আমার বাবা ছিলেন পেশায় একজন কৃষক। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হয়তো দ্বিতীয় কি তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত, কিন্তু আমার কাছে তিনি ছিলেন এক মহাজ্ঞানী দার্শনিক ও ন্যায়নিষ্ঠ বিচারক।
আমার জীবনের দুটি অপরাধে তিনি যে রায় দিয়েছিলেন, তা আজও আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ পাথেয়। প্রথম ঘটনা: আমি তখন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ি। আমাদের বাড়ির দিনমজুরের ছেলের সঙ্গে খেলতে গিয়ে আমার ঝগড়া হয়। আমি মার খেয়ে ঠোঁট ফাটিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাবার কাছে বিচার চাইলাম। বাবা আমাকে সান্ত্বনা না দিয়ে উল্টো চড় মেরে বললেন, ‘কেন তুমি ওর সঙ্গে মারামারি করতে গিয়েছ?’ কিছুক্ষণ পর দিনমজুর তার ছেলেকে নিয়ে অভিযোগ করতে এলে বাবা কোনো প্রকার শুনানি ছাড়াই আমাকে বেত দিয়ে প্রহার করলেন। এমনকি আমার দাদী এসে বাবাকে শাসন করলেও বাবা দমে যাননি। তিনি শুধু বলেছিলেন, ‘ওর সঠিক শিক্ষার জন্য এটি প্রয়োজন ছিল।’
সেদিন রাগে-অভিমানে রাতে ভাত খাইনি, পরে জেনেছি আমার বাবা-মাও সেদিন অভুক্ত ছিলেন। আজ বুঝি, বাবার সেই কঠোর শাসনই আমাকে বিপথগামী হওয়া থেকে বাঁচিয়েছে। অথচ সেই খেলার সাথীটি আজ চৌর্যবৃত্তির দায়ে জেল খেটে মানবেতর জীবনযাপন করছে। এটি তার বাবার অন্ধ স্নেহেরই কুফল। দ্বিতীয় ঘটনা: আমি তখন বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের নবীন সদস্য হিসেবে গাইবান্ধা সরকারি কলেজে কর্মরত। এক শুক্রবার মসজিদে ইমাম সাহেবের একটি ভুল ধরিয়ে দেওয়ায় মুসল্লিরা আমার পক্ষ নিলেও বাবা কঠোর অবস্থান নিলেন। তিনি বললেন, ‘নিজেকে জ্ঞানী জাহির করার জন্য জনসমক্ষে ইমামের ভুল ধরা বেয়াদবি।’ বাবার নির্দেশে সেদিন আমি সবার সামনে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হই। দাদীর কাছে নালিশ করেও লাভ হয়নি; তিনিও বলেছিলেন, ‘শিক্ষক বা ইমামের ভুল জনসমক্ষে ধরতে নেই।’ বাবার যুক্তি ছিল স্পষ্ট—‘আজ প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হওয়ায় বাইরে কেউ তাকে শাসন করবে না, তাই সংশোধনের দায়িত্ব পিতাকেই নিতে হবে।’ বাবার সেই রায় আজও আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করি, যার ফলে কোনো জনসমক্ষে আমাকে আজ পর্যন্ত বিব্রত হতে হয়নি। সন্তান প্রত্যেক বাবা-মায়ের কাছে কলিজার টুকরো। কিন্তু সেই কলিজার টুকরোকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়তে হলে বাবা-মা ও শিক্ষকের পরিমিত শাসন অপরিহার্য। অন্যায় প্রশ্রয় দিয়ে কখনো আদর্শ মানুষ গড়া সম্ভব নয়।
উপসংহার:সন্তানের অন্যায় আবদারকে প্রশ্রয় দেওয়া স্নেহ নয়, বরং তার ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের পথে ঠেলে দেওয়া; প্রকৃত পিতা তিনিই, যিনি মমতার চেয়ে ন্যায়বিচারকে প্রাধান্য দিয়ে সন্তানকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলেন।
প্রকাশক ও সম্পাদক সোহেল সরকার কর্তৃক লন্ডন যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
সহ সম্পাদকঃ শেখ ফরিদ হোসেন বার্তা সম্পাদকঃ জিয়াউল ইসলাম জিয়া
WhatsApp 00447798833284 (United Kingdom)
ইমেইলঃ promothalo.com@gmail.com
Copyright © 2026 প্রমথ আলো । বাংলা নিউজ পেপার. All rights reserved.