

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ১৩১ বছর আগে আমেরিকাকে দেওয়া ফ্রান্সের উপহার। ‘বছরের পর বছর ধরে এই মূর্তির অর্থ এতই বিস্তৃত হয়েছে যে স্ট্যাচু অব লিবার্টি এখন স্বাধীনতা ও মুক্তির একটি আন্তর্জাতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে, যা গণতন্ত্রের সবচেয়ে পরিচিত নিদর্শন হয়ে উঠেছে,‘ ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিস এই মন্তব্য করেছে, যে দপ্তরটি এই মূর্তি ও এলিস দ্বীপ, উভয়ের দেখাশোনার দায়িত্বে নিয়োজিত। আগামী ২৮ অক্টোবর আমেরিকা একটি বিশাল জন্মদিনের পার্টি দিয়ে স্ট্যাচু অব লিবার্টির ১৩১তম বার্ষিকী উদ্যাপন করবে।
মূর্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের লক্ষ্যে নিউইয়র্ক বন্দরে জাহাজের বহর, সঙ্গীতানুষ্ঠান, বক্তৃতা, একটি কেক ও বিশাল আতশবাজি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। পাশাপাশি একটি নাগরিকত্ব প্রদান অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হবে, যেখানে ১২৫ জনকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতী দেওয়া হবে। তামার তৈরি ৯৩ মিটার উঁচু এই মূর্তি ১৮৮৬ সালে ফ্রান্সের জনগণের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে উপহার দেওয়া হয়। মূর্তিটি আমেরিকান বিপ্লবের সময় প্রতিষ্ঠিত মিত্রতার স্মারক।
১৮৮৪ সালে ফ্রান্সে এই মূর্তি তৈরি করা হয়, এরপর মূর্তিটি কয়েক ভাগে আলাদা করে নিউইয়র্কে জাহাজে করে পাঠানো হয়, যেখানে মূর্তিটি পুনরায় স্বরূপে সংযুক্ত করা হয়। ১৮৮৬ সালের ২৮ অক্টোবর হাজার হাজার উল্লসিত দর্শকের সম্মুখে মূর্তিটি স্থাপন করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের মধ্যকার সম্পর্ককে দুই দেশেরই স্বাধীনতা ও মুক্তির আদর্শের একটি প্রতীক দ্বারা সমৃদ্ধ করতে ১৮৬৫ সালের দিকে ফরাসি আইনের অধ্যাপক, রাজনীতিবিদ ও লেখক এডুয়ার্ড দ্য লাবুলে মূর্তিটির পরিকল্পনা করেন। বিশাল আকারের শিল্পকর্মের জন্য খ্যাত শিল্পী ফ্রেদেরিক-অগাস্ট বার্থোল্ডিকে মূর্তিটি তৈরি করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। একটি মানানসই স্থান নির্বাচনের জন্য বার্থোল্ডি যুক্তরাষ্ট্রে যাত্রা করেন এবং নিউইয়র্ক বন্দরের বেডলোস আইল্যান্ড (১৯৫৬ সালে দ্বীপটির নামকরণ করা হয় লিবার্টি আইল্যান্ড) নামের ছোট একটি দ্বীপ মূর্তিটির স্থাপনাস্থল হিসেবে নির্বাচন করেন।
যেহেতু মূর্তিটি আমেরিকা ও ফ্রান্সের মধ্যকার একটি যৌথ উদ্যোগ ছিল, এ জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে আমেরিকানরা মূর্তিটির ভিত্তিস্তম্ভ গড়ে তুলবে এবং ফ্রান্সের জনগণ মূর্তি ও তার সংযুক্তকরণের দায়িত্ব নেবে।
ফ্রান্সে নগর সরকারগুলোর কাছ থেকে, মূর্তিটির ক্ষুদ্র প্রতীকৃতীর বিক্রয়মূল্য থেকে, লটারি থেকে এবং ফ্রান্সের স্কুলের শিশু ও অন্যান্যের অনুদানের মাধ্যমে মূর্তিটির জন্য অর্থ সংগ্রহ করা হয়। প্রায় ২০ লাখ ফ্রাঁ (সে সময় প্রায় চার লাখ ডলার সমমান) সংগ্রহ করা হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রে অর্থ সংগ্রহ করাটা তুলনামূলক কঠিন ছিল। প্রকাশক জোসেফ পুলিৎজার এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসেন এবং অনুদানের জন্য তাঁর পত্রিকা নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ডুএ প্রচেষ্টা শুরু করেন। তিনি তাঁর পত্রিকায় সব অনুদানকারীর নাম ছাপা শুরু করেন, এমনকি কয়েক পয়সা অনুদান দেওয়া স্কুলছাত্রদের নামও সেই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অনুদানের দাতার তালিকা ১ লাখ ২০ হাজার ছাড়িয়ে যায়, যাদের মধ্যে অনেকেই এক ডলারেরও কম প্রদান করেছিল। এভাবেই আমেরিকানরা মূর্তিটির ভিত্তিস্তম্ভের জন্য আড়াই লাখ ডলার অনুদান প্রদান করে।
বার্থোল্ডি মূর্তিটি নির্মাণ করেনণ্ডমূর্তিটির পুরো নাম হলো ‘লিবার্টি এনলাইটনিং দ্য ওয়ার্ল্ড’ণ্ডমূর্তিটি যে তামা থেকে তৈরি, সেটা পেটাতে পেটাতে ২ দশমিক ৪ মিলিমিটার পুরুত্বে নিয়ে আসা হয়। ফরাসি প্রকৌশলী আলোন্ডার-গুস্তাভ আইফেল (আইফেল টাওয়ারের ডিজাইনার) মূর্তিটির জন্য একটি অবকাঠামো তৈরি করেন। অবকাঠামোটি এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে মূর্তিটির তাম্রদেহটি আলাদাভাবেই নড়াচড়া করানো সত্ত্বেও সেটা সোজা দাঁড়িয়ে থাকতে সক্ষম হবে। এ জন্যই মূর্তিটি বন্দরের বাতাসে দোল খেতেও সক্ষম। লেডি লিবার্টি নামেও পরিচিত মূর্তিটি এর ভিত্তিস্তম্ভের পাদদেশ থেকে এর হাতের মশালের মাথা পর্যন্ত ৯৩ মিটার উঁচু।
মূর্তিটির গোড়ালি থেকে মাথা পর্যন্ত উচ্চতা ৩৪ মিটার। বছরের পর বছর প্যাটিনেশন নামের একধরনের রাসায়নিক বিক্রিয়ার জন্য এর তামার রং সবুজ হয়ে উঠেছে। ১৯৮৪ সালে জাতিসংঘ স্ট্যাচু অব লিবার্টিকে বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী স্থানের অন্তর্ভুক্ত করে। দুই বছরব্যাপী মূর্তিটির সংস্কারকাজের পর ১৯৮৬ সালে আবারও দর্শকদের জন্য মূর্তিটি উন্মুক্ত করা হয়। এই বছরই মূর্তিটির ১০০তম বার্ষিকী উদ্যাপন করা হয়। এই সংস্কার প্রকল্পের সময়ই নতুন মশালটিতে ২৪ ক্যারেট স্বর্ণের পাতলা আবরণ দেওয়া হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রিজার্ভেশনের মাধ্যমে দর্শনার্থীরা মূর্তিটির ভিত্তিস্তম্ভ ও মাথার তাজের ওপর উঠতে পারেন। অক্টোবরের ২৯ তারিখ থেকে মূর্তির অভ্যন্তরীণ অংশ আরও সংস্কারকাজের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হবে।
তবে লিবার্টি দ্বীপ দর্শনার্থী ও তাঁদের ক্যামেরার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। স্ট্যাচু অব লিবার্টি ১৮৯২ থেকে ১৯৫৪ সালের মধ্যে কাছাকাছি অবস্থিত এলিস দ্বীপের ফেডারেল অভিবাসন স্টেশন থেকে আসা ১ কোটি ২০ লাখেরও অধিক অভিবাসীকে যুক্তরাষ্ট্রে স্বাগত জানায়। পুরোনো অভিবাসন স্টেশনটি এখন একটি জাদুঘরে পরিণত করা হয়েছে। দর্শনার্থীরা ফেরিতে করে এলিস দ্বীপ ও স্ট্যাচু অব লিবার্টির স্থাপনাস্থল লিবার্টি দ্বীপে গমন করতে পারেন।
প্রকাশক ও সম্পাদক সোহেল সরকার কর্তৃক লন্ডন যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
সহ সম্পাদকঃ শেখ ফরিদ হোসেন বার্তা সম্পাদকঃ জিয়াউল ইসলাম জিয়া
WhatsApp 00447798833284 (United Kingdom)
ইমেইলঃ promothalo.com@gmail.com
Copyright © 2026 প্রমথ আলো । বাংলা নিউজ পেপার. All rights reserved.