প্রিয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে শেষ বিদায় জানাতে রাজধানী ঢাকায় নেমে আসে মানুষের ঢল। দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ শোক আর শ্রদ্ধায় একাত্ম হয়ে অংশ নেন এই আবেগঘন বিদায়ের মুহূর্তে। সকাল থেকেই ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত ও দেশের নানা জেলা থেকে দলে দলে মানুষ ছুটে আসেন জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে।
রাজনৈতিক নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, শিক্ষক, শ্রমজীবী, ব্যবসায়ী, সংস্কৃতিকর্মী—সবাই যেন এক কাতারে দাঁড়িয়ে প্রিয় নেত্রীর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। কারও হাতে ফুল, কারও চোখে অশ্রু, আবার কারও কণ্ঠে নীরব প্রার্থনা—চারপাশজুড়ে বিরাজ করে গভীর শোক ও মানবিক আবেগ। বিশেষভাবে চোখে পড়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য দৃশ্য।
মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান—সব ধর্মের মানুষ নিজ নিজ বিশ্বাস অনুযায়ী প্রার্থনায় অংশ নেন। অনেকেই বলেন, বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন সকলের নেত্রী; তিনি বিশ্বাস করতেন মানবিক রাজনীতি, সহনশীলতা ও সহাবস্থানে।
খুলনার পাইকগাছা উপজেলার এক নম্বর হরি ঢালী ইউনিয়ন বিএনপির নেতা মীর শাফায়েত আলী(শাবান আলী) বলেন,“তিনি শুধু একটি দলের নেত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন জাতির অভিভাবকের মতো। তাঁর মৃত্যু আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।”
পিরোজপুর জেলার বালিপাড়া থেকে আসা মজিদ শেখ বলেন,“আমাদের মা আজ আমাদের মাঝে নেই। আপনারা তাঁর জন্য দোয়া করবেন।” একই এলাকার বিএনপির সভাপতি হাবিবুর রহমান হবি বলেন,“আপসহীন এই নেত্রীর মৃত্যুতে দেশ এক মহামূল্যবান রত্ন হারালো। এই ক্ষতি কখনো পূরণ হওয়ার নয়। এ সময় বাংলাদেশ সম্মিলিত নাগরিক দলের মহাসচিব নুরুল হুদা খান বাবু বলেন,“মহান এই নেত্রীর শেষ বিদায় জানাতে আমরা এসেছি। এমন একজন নেত্রী আর খুঁজে পাওয়া কঠিন। দেশের গণতন্ত্র রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানাই। এ বিষয়ে দক্ষিণ অঞ্চল সাংবাদিক ইউনিয়নের উপদেষ্টা আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া বলেন, মহান নেত্রীর মৃত্যুতে গোটা দেশবাসীর যেন অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হয়েছেন। তিনি দেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই গণতন্ত্র বাঁচিয়ে রাখার জন্য আগামী নির্বাচনে তারেক জিয়ার হাতকে শক্তিশালী করতে হবে। শোকের এই বিশাল সমাবেশ ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নেওয়া হয় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ, স্বেচ্ছাসেবকদের তৎপরতা এবং মেডিকেল টিমের প্রস্তুতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেষ বিদায়ে মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি বেগম খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা ও বহুমাত্রিক নেতৃত্বেরই প্রতিফলন। সরেজমিনে দেখা যায়, দলীয় কার্যালয়সহ বিভিন্ন সড়কে উড়ছে কালো পতাকা। ঢাকার আশপাশের জেলা থেকে ভোর থেকেই মিছিল নিয়ে আসেন নেতাকর্মীরা। দল-মত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাতে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ অভিমুখে ছুটে আসেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমের ধারণা অনুযায়ী, জানাজায় অংশ নেন প্রায় ৩০ লক্ষাধিক কাছাকাছি মানুষ। বুধবার বিকাল ৩টা ৩ মিনিটের
জাতীয় সংসদ ভবন মাঠ ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে বেগম খালেদা জিয়ার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
জানাজায় ইমামতি করেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মাওলানা আবদুল মালেক। এতে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানসহ বিভিন্ন বাহিনীর প্রধান এবং সব রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা অংশ নেন।এ সময় বেগম খালেদা জিয়ার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চান তাঁর জ্যেষ্ঠ সন্তান ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি বলেন,
“মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া জীবিত থাকা অবস্থায় যদি কারও কাছে কোনোভাবে ঋণী হয়ে থাকেন, দয়া করে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। আমি তা পরিশোধের ব্যবস্থা করব, ইনশাল্লাহ। একই সঙ্গে তাঁর কোনো কথা বা আচরণে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে, আমি তাঁর পক্ষ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।”
তিনি দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়ে বলেন,“আল্লাহ তায়ালা যেন তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন।”
এরপর পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেরেবাংলা নগরে তাঁর স্বামী, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে বেগম খালেদা জিয়াকে সমাহিত করা হবে।
উল্লেখ্য, মঙ্গলবার ভোরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন) বাংলাদেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। জীবনের শেষ মুহূর্তে তাঁর পাশে ছিলেন বড় ছেলে তারেক রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা।শেষ বিদায়ের এই বিশাল জনসমাগম আবারও প্রমাণ করে—সংকট ও শোকের মুহূর্তে বাংলাদেশ এখনো ঐক্য, মানবিকতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির শক্তিতে বিশ্বাসী। প্রিয় নেত্রীর স্মৃতি দেশের মানুষকে দীর্ঘদিন এই ঐক্যের বার্তাই স্মরণ করিয়ে দেবে।