মুখ ও চোয়ালের জটিল রোগ, দুর্ঘটনাজনিত আঘাত এবং প্রাণঘাতী ওরাল ক্যানসারের মতো রোগে আক্রান্ত মানুষের জন্য অবশেষে আশার আলো দেখাচ্ছে চট্টগ্রাম। বন্দরনগরীতে একটি পূর্ণাঙ্গ ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম এগিয়ে চলছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ওরাল ও ম্যাক্সিলোফেসিয়াল স্বাস্থ্য আর অবহেলার তালিকায় রাখার সুযোগ নেই—এটি এখন সরাসরি জনস্বাস্থ্যের অগ্রাধিকার ইস্যু।
গতকাল শুক্রবার নগরীর ঐতিহ্যবাহী চিটাগং ক্লাবে অনুষ্ঠিত ‘Second International Scientific Conference on Oral & Maxillofacial Surgery’–এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে মেয়র বলেন, মুখগহ্বর ও চোয়ালসংক্রান্ত রোগ চিকিৎসায় বিশেষায়িত অবকাঠামো ও দক্ষ জনবল ছাড়া কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এই খাতটি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে উপেক্ষিত থেকেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) পরিসংখ্যান তুলে ধরে মেয়র বলেন, বিশ্বব্যাপী প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন মানুষ কোনো না কোনো ধরনের মুখগহ্বরজনিত রোগে আক্রান্ত। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ওরাল ক্যানসার ইতোমধ্যে একটি মারাত্মক জনস্বাস্থ্য সমস্যায় রূপ নিয়েছে। এই বাস্তবতা স্পষ্ট করে দেয়—ওরাল ও ম্যাক্সিলোফেসিয়াল স্বাস্থ্য কোনো বিলাসী বা সীমিত চিকিৎসা নয়, বরং এটি একটি বৃহৎ জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় চিত্র আরও উদ্বেগজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওরাল ক্যানসার দেশে শীর্ষস্থানীয় ক্যানসারগুলোর একটি। তামাক, ধূমপানবিহীন তামাক এবং পান-সুপারি সেবনের মতো সামাজিকভাবে প্রচলিত অভ্যাস এর প্রধান কারণ। সচেতনতার অভাবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগ দেরিতে শনাক্ত হয়, ফলে চিকিৎসার সাফল্য আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। অন্যদিকে নগরায়ণ, সড়ক দুর্ঘটনা ও কর্মক্ষেত্রের ঝুঁকিতে মুখ ও চোয়ালের জটিল আঘাতের সংখ্যা বাড়লেও বড় শহরের বাইরে বিশেষায়িত চিকিৎসা আজও অপ্রতুল।
স্থানীয় সরকার ও সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মেয়র বলেন, ওরাল ক্যানসার প্রতিরোধে তামাকবিরোধী কার্যক্রম জোরদার, গণসচেতনতা সৃষ্টি এবং কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যশিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে রোগীরা দ্রুত বিশেষায়িত চিকিৎসার আওতায় আসতে পারেন।
তিনি বলেন, দ্রুত বর্ধনশীল মহানগর চট্টগ্রামের নগর স্বাস্থ্য পরিকল্পনায় ওরাল ও ম্যাক্সিলোফেসিয়াল স্বাস্থ্যকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এ কারণেই একটি পূর্ণাঙ্গ ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠান কেবল চিকিৎসা সেবাই নয়, ভবিষ্যতে দক্ষ জনবল তৈরি, গবেষণা সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন ডা. মনোজ কুমার বড়ুয়া। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ডেন্টাল সোসাইটি ও ডেন্টাল শিক্ষাব্যবস্থার শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ ও বিশেষজ্ঞরা। বক্তারা বলেন, নীতিনির্ধারক ও চিকিৎসকদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ওরাল স্বাস্থ্য খাতে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি সম্ভব নয়।
আয়োজকদের ধন্যবাদ জানিয়ে মেয়র বলেন, এ ধরনের আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলন জ্ঞান বিনিময় ও গবেষণার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে, যার সুফল শেষ পর্যন্ত সাধারণ রোগীর দোরগোড়ায় পৌঁছায়।
সমাপনী বক্তব্যে তিনি বলেন, প্রতিরোধ, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ও বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবার সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমেই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা–৩ (সকলের জন্য সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ) অর্জন সম্ভব। এ ক্ষেত্রে ওরাল ও ম্যাক্সিলোফেসিয়াল স্বাস্থ্য খাতকে আর পিছনে ফেলে রাখার সুযোগ নেই।