
বিএনপির নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগে সংবাদ প্রকাশের জেরে মানিকগঞ্জের সিংগাইরে দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আদালতে মিথ্যা মামলা করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত ১৯ জানুয়ারি মানিকগঞ্জ বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল আদালতে এই মামলা করেন উপজেলার তালেবপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুল হাই। মামলায় আসামী করা হয় দৈনিক জনকণ্ঠ, আমার বার্তা ও নাগরিক সংবাদের স্থানীয় প্রতিনিধি হাবিবুর রহমান রাজিব এবং শীর্ষনিউজের মাল্টিমিডিয়া প্রধান জসিম উদ্দিন সরকারকে। এই মিথ্যা মামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন মানিকগঞ্জ প্রেসক্লাব, মানিকগঞ্জ টেলিভিশন রিপোর্টার্স ইউনিটির (টিআরইউ), মানিনকগঞ্জ সম্পাদক পরিষদ ও সিংগাইর উপজেলা প্রেসক্লাবের নেতৃবৃন্দ।
লিখিত অভিযোগ ও স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৩ ডিসেম্বর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বরাবর উপজেলার তালেবপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুল হাইয়ের বিরুদ্ধে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবির লিখিত অভিযোগ দেন তালেবপুর ১নং ওয়ার্ড এলাকার কাংশা গ্রামের প্রবাসী লাভলু মিয়া। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বিএনপি নেতা আব্দুল হাই তার কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে মামলায় ফাঁসানো ও জমি দখলের ভয়ভীতি দেখান। একপর্যায়ে একটি রাজনৈতিক মিথ্যা হত্যা মামলায় তাঁকে ফাসিয়ে দেওয়া হয়। এই মামলায় কারাবরণও করেন তিনি।
লাভলু মিয়া বলেন, চাঁদা না দেওয়ায় গত বছরের ২ ডিসেম্বর দলবল নিয়ে আমার জমি দখলের চেষ্টা করে আব্দুল হাই। বিষয়টি জাতীয় জরুরী নম্বর ৯৯৯ এ ফোন করে পুলিশকে জানানো হয়। পরে থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) জসিম উদ্দিন সঙ্গীয় পুলিশ ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে আসলে চলে যায় আব্দুল হাই ও তাঁর লোকজন।
এবিষয়ে থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) জসিম উদ্দিন বলেন, ৯৯৯ থেকে ফোন পেয়ে ঘটনাস্থল গিয়ে দেখি আব্দুল হাই দলবল নিয়ে জমিতে সিমেন্টের খুটি স্থাপন করছেন। পুলিশের উপস্থিতি দেখে সেখান থেকে লোকজন নিয়ে চলে যান তিনি।
এঘটনায়“চাঁদা না পেয়ে জমি দখলের অভিযোগ বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করেন সাংবাদিক হাবিবুর রহমান রাজিব ও জসিম উদ্দিন সরকার। সংবাদ প্রকাশের জেরে তাঁদের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ৫ ডিসেম্বর থানায় চাঁদাবাজির অভিযোগ দেন আব্দুল হাই। তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা না পেয়ে অভিযোগটি আমলে নেয়নি থানা পুলিশ। একই অভিযোগে ওই বছরের ১১ ডিসেম্বর মানিকগঞ্জ বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল আদালতে মামলার আবেদন করেন আব্দুল হাই। এছাড়া এদিন প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে একই আদালতে আরও একটি মামলার আবেদন দেন তাঁর মামলার স্বাক্ষী শরীফ উদ্দীন চঞ্চল। ঘটনার সত্যতা নিয়ে সন্দেহ হলে দুইটি মামলাই খারিজ করেদেন আদালত।
এর প্রায় দেড় মাস পর শুধু তারিখ ও সময় পরিবর্তন করে একই অভিযোগে চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি আবার তাঁদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলার আবেদন করেন ধুরন্ধর আব্দুল হাই। এই মামলার ঘটনার সময় দেখানো হয় ২০২৬ সালের ২ জানুয়ারি বেলা ১১ টা। আর আগের খারিজ হওয়া মামলার ঘটনার সময় দেখানো হয়েছিল ২০২৫ সালের ২ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ১১ টা। এবার মামলাটি আমলে নিয়ে জেলা গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি) তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।
মামলার সাক্ষী জিয়াউল হক জিয়া বলেন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের প্রথম দিকে তালেবপুর বাজারে আমার দোকানে এসে আব্দুল হাই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে চাঁদা চাওয়ার বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। এবিষয়ে আমি কিছু দেখিনি ও জানিওনা। তদন্তের জন্য থানার তৎকালীন এসআই পার্থ শেখর ঘোষ আমার কাছে এসেছিল। আমি তাকেও একই কথা বলেছি। আমাকে দিয়ে কেউ মিথ্যা কথা বলাতে পারবে না।
অপর সাক্ষী সবুজ বলেন, আমি সরাসরি চাঁদা চাওয়ার কথা শুনিনি ও দেখিনি। আব্দুল হাই মামলার বিষয়টি আমাকে বলেছে। বাদীর আত্মীয় হলেও আমি কখনো মিথ্যা সাক্ষী দেব না।
এবিষয়ে থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) পার্থ শেখর ঘোষ বলেন, ২০২৫ সালের ৫ ডিসেম্বর) সাংবাদিক হাবিবুর রহমান রাজিব ও জসিমউদ্দীনের বিরুদ্ধে একটি চাঁদাবাজির অভিযোগ দেন বিএনপি নেতা আব্দুল হাই। থানার তৎকালীন ওসি তৌফিক আজমের নির্দেশে অভিযোগটি তদন্তের জন্য ঘটনাস্থলে গিয়ে আব্দুল হাইসহ স্বাক্ষী ও স্থানীয় লোকজনের সাথে কথা বলা হয়। তাঁদের সাথে কথা বলে ঘটনাটি সত্য বলে প্রতীয়মান হয়নি। একারণে ওসি স্যার অভিযোগটি আমলে নেননি।
এ বিষয়ে মামলার বাদী তালেবপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোহাম্মদ আব্দুল হাই মুঠোফোনে বলেন, জমি নিয়ে বিরোধের জেরে উপজেলা প্রশাসনের কাছে আমার বিরুদ্ধে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবীর অভিযোগ দেয় লাভলু। এঘটনা নিয়ে আমাকে জড়িয়ে সংবাদ প্রকাশ করে সাংবাদিক হাবিবুর রহমান রাজিব ও জসিম উদ্দিন সরকার। এতে সমাজে আমার সম্মান নষ্ট হয়। তাই আমিও তাঁদের বিরুদ্ধে আদালতে চাঁদাবাজির মামলা করেছি।
ভুক্তভোগী সাংবাদিক হাবিবুর রহমান রাজীব বলেন, প্রবাসী লাভলু মিয়ার লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতেই সংবাদ প্রকাশ করা হয়। সংবাদ প্রকাশের জেরে ২০২৫ সালে অনেক চেষ্টা তদবির করেও মামলা করতে ব্যর্থ হন। আবার সেই একই কাহিনি সাজিয়ে ২০২৬ সালে ঘটনা দেখিয়ে মামলা করেছেন। এটিই প্রমাণ করে মামলাটি সম্পুর্ন মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। তাছাড়া ঘটনার আগে পরে কখনো কোথাও আব্দুল হাই-এর সাথে আমার দেখা-সাক্ষাতও হয়নি। শুধু অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্যের জন্য ফোন তাঁকে করেছিলাম।
শীর্ষনিউজের মাল্টিমিডিয়া প্রধান জসিম উদ্দিন সরকার বলেন, মামলায় ঘটনার যে দিনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, ওইদিন আমি ঢাকায় অফিসে কর্মরত ছিলাম। চাঁদা চাওয়া তো দুরের কথা মামলার বাদি আব্দুল হাইকে আমি কখনো দেখিনি। সেও আমাকে চিনেন না। তাঁর সাথে আমার কখনো দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। এমনকি কোনোদিন ফোনেও কথা হয়নি।
এদিকে দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন মানিকগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বিশ্বাস, মানিকগঞ্জ টেলিভিশন রিপোর্টার্স ইউনিটির (টিআরইউ) সভাপতি
যমুনা টেলিভিশনের সিনিয়র করেসপনডেন্ট বি এম খোরশেদ, সাধারণ সম্পাদক ডিবিসি টেলিভিশনের আশরাফুল আলম লিটন, মানিনকগঞ্জ সম্পাদক পরিষদ সভাপতি শহিদুল ইসলাম সুজন, সাধারণ সম্পাদক আকরাম হোসেন, সিংগাইর উপজেলা প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক মোবারক হোসেন ও সদস্য সচিব সুজন মোল্লাসহ জেলা এবং উপজেলায় বিভিন্ন প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় কর্মরত সাংবাদিকরা। সেই সঙ্গে অভিলম্বে মামলা প্রত্যাহার ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে মামলার বাদীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তাঁরা।
জেলা গোয়েন্দা শাখার (পূর্ব) পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন বলেন, ঘটনার সত্যতা সাপেক্ষে মামলার বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলা নিউজ মিডিয়া কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত
সারাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে WhatsApp & IMO 01886833283
সাথী সোহেল জনকল্যাণ ফাউন্ডেশন নগদ/বিকাশঃ ০১৩০২৪৪৭৩৭৩