ভালোবাসার আশ্বাস, বিয়ের অভিনয়, খালি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর আর শেষে হঠাৎ তালাক—শুধুমাত্র নিজের যৌন চাহিদা পূরণের উদ্দেশ্যে এক তরুণীর সঙ্গে মিথ্যা বিয়ের নাটক সাজানোসহ প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার এক যুবকের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় গত বছরের ডিসেম্বর মাসে চট্টগ্রাম চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলা দায়ের করা হয়।
মামলাটি দায়ের করেন লোহাগাড়া উপজেলার বাসিন্দা ছাদেকা আকতার (২৮)। আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৬, ৪২০ ও ৫০৬(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার আসামি সাতকানিয়া উপজেলার বারদোনা এলাকার নুরু মাস্টারের বাড়ির জাফর আহমদের ছোট ছেলে আবদুল্লাহ মাসুদ (৩০)। প্রতারণাপূর্বক তালাককাণ্ডের পরপরই তিনি পলাতক রয়েছেন।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, অভিযুক্ত আবদুল্লাহ মাসুদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী। কেবল নিজের যৌন চাহিদা পূরণের উদ্দেশ্যে তিনি দীর্ঘদিন ধরে একটি সাজানো বিয়ের ফাঁদে ভুক্তভোগীকে আটকে রাখেন। বিয়ের নামে যা ঘটেছে, তা আদতে ছিল একটি সুপরিকল্পিত প্রতারণা।
মামলার নথি ও ভুক্তভোগীর বক্তব্য অনুযায়ী, পূর্বে বিবাহবিচ্ছেদের পর মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অভিযুক্তের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। শুরুতে সহানুভূতি, নিয়মিত খোঁজখবর ও ভালোবাসার অভিনয়ের মাধ্যমে তার বিশ্বাস অর্জন করা হয়। একপর্যায়ে সম্পর্ক গড়ায় প্রেমে। পরে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন ও সংসার করার পথ তৈরি করা হয়।
ভুক্তভোগীর পরিবার বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে অভিযুক্ত ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। এরপর সামাজিক ও আইনগতভাবে বৈধ বিয়ের পরিবর্তে তিনি প্রতারণার শর্টকাট পথ বেছে নেন—এমনটাই মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৩ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি বিয়ের কথা বলে অভিযুক্ত তাকে চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গনে নিয়ে যান। সেখানে নিকাহনামা রেজিস্ট্রেশন বা বৈধ কাবিননামা সম্পাদনের কোনো উদ্যোগ না নিয়ে কেবল একটি হলফনামা করিয়ে বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে বলে বিশ্বাস করানো হয়। ওই হলফনামাকেই বিয়ের প্রমাণ হিসেবে দেখিয়ে অভিযুক্ত ভুক্তভোগীর সঙ্গে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে সংসার করতে থাকেন।
পরবর্তীতে ভুক্তভোগীর পরিবার কাবিননামা দেখতে চাইলে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত স্বীকার করেন, তাদের মধ্যে আদৌ কোনো কাবিননামা সম্পাদন হয়নি। তখন কৌশলে জানানো হয়, পরে শহরে গিয়ে কাবিননামা করা হবে।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে অভিযুক্ত ভুক্তভোগীর কাছ থেকে একটি অলিখিত কাবিনের পাতায় স্বাক্ষর নেন। সেদিন একজন ব্যক্তিকে কাজি পরিচয় দিয়ে হাজির করা হলেও সেখানে কোনো সাক্ষী, আত্মীয় কিংবা আইনসম্মত প্রক্রিয়ার উপস্থিতি ছিল না। ওই সময় দুজন ছাড়া আর কেউ উপস্থিত ছিলেন না বলে ভুক্তভোগী নিশ্চিত করেন। এরপর আবারও হলফনামার কথা বলে ৫০০ টাকা মূল্যের একাধিক খালি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। সরল বিশ্বাসে ভুক্তভোগী এসব কাগজে স্বাক্ষর করলে অভিযুক্ত পুনরায় সংসার শুরু করেন।
ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, তখন তিনি ধারণাও করেননি—এই খালি স্ট্যাম্পই একদিন তার বিরুদ্ধে ভয়ংকর অস্ত্রে পরিণত হবে।
২০২৩ সালের ২৬ অক্টোবর ডাকযোগে একটি খাম হাতে পান ভুক্তভোগী। খাম খুলে তিনি দেখতে পান, তার স্বাক্ষর করা খালি স্ট্যাম্পে তৈরি করা হয়েছে সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন একটি ‘তালাক সংক্রান্ত সমঝোতামূলক হলফনামা’। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক সালিশ বসে। সেখানে অভিযুক্ত নিজের দোষ স্বীকার করে অনুতাপ প্রকাশ করেন এবং ক্ষমা চেয়ে আবার সংসারে ফিরিয়ে নেন। তবে কিছুদিন পর হঠাৎ করেই অভিযুক্ত নিখোঁজ হন। পরে ভুক্তভোগী জানতে পারেন, তিনি অনেক আগেই বিদেশে পালিয়ে গেছেন। উপায় না পেয়ে অবশেষে এই তরুণী আদালতের শরণাপন্ন হন।
এদিকে অভিযুক্ত আবদুল্লাহ মাসুদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি মামলাটিকে “মিথ্যা ও ভিত্তিহীন” বলে দাবি করেন। উল্টো ভুক্তভোগীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলে ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ করেন। তবে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেননি। বিয়ের সময় উপস্থিত কাজি বা সাক্ষীদের নাম জানতে চাইলে তিনি কোনো নাম বলতে পারেননি। কাবিননামা, তালাক বা হলফনামার কপি দেখানোর অনুরোধেও তিনি অনাগ্রহ প্রকাশ করেন।
অভিযুক্তের বড় ভাই মো. মামুনুর রশিদ জানান, তাদের পরিবার বিয়ে ও বিচ্ছেদের বিষয়টি জানত না। কয়েকদিন আগে ওই তরুণী তাদের বাড়িতে অবস্থান করলে তারা বিষয়টি জানতে পারেন। তার দাবি, পরে তিনি কাগজপত্র যাচাই করে দেখেছেন এবং তার মতে যা হয়েছে আইন মেনেই হয়েছে।
এ বিষয়ে আইনজীবীরা বলছেন, সাক্ষীহীন বিয়ে, খালি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া এবং পরে তালাকের দাবি—এই তিনটি বিষয় একত্রে একটি সুপরিকল্পিত প্রতারণার দিকেই ইঙ্গিত করে।