নিজস্ব প্রতিবেদক: বগুড়ায় এক দরিদ্র নারীর মৃত্যুর পর মানবিকতার দৃষ্টান্ত নয়, বরং লোভ, অনৈতিকতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের এক ভয়ংকর চিত্র সামনে এসেছে। মৃত নারীর ঘর থেকে উদ্ধার করা নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকার স্বজনদের হাতে তুলে দেওয়ার পরিবর্তে পুলিশের এক কর্মকর্তার পকেটে চলে গেছে—এমন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বগুড়া সদর থানার স্টেডিয়াম পুলিশ ফাঁড়িতে সদ্য কর্মরত উপপরিদর্শক (এসআই) জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে।
২০ হাজার টাকা ও চার আনা স্বর্ণ ‘উদ্ধার’, কিন্তু গেল কোথায়?
অভিযোগ অনুযায়ী, মৃত নারীর ঘর থেকে উদ্ধার করা ২০ হাজার টাকা নগদ ও চার আনা ওজনের স্বর্ণালংকার কোনো জব্দ তালিকা ছাড়াই নিজেদের হেফাজতে নেন এসআই জাহাঙ্গীর আলম। স্থানীয়দের দাবি, এসব অর্থ ও স্বর্ণ কখনোই স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি; বরং আত্মসাৎ করা হয়েছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে এসআই জাহাঙ্গীর আলম দাবি করেন,
“উদ্ধার করা টাকা ও স্বর্ণ থানায় জিডি করে আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে।”
আদালত ও থানার নথিতে নেই কোনো অস্তিত্ব
এসআইয়ের এই দাবির সঙ্গে সরকারি নথিপত্রের সরাসরি সাংঘর্ষিক তথ্য পাওয়া গেছে।
বগুড়া আদালত পুলিশের জেনারেল রেকর্ড অফিসার (জিআরও) সুশান্ত কুমার স্পষ্টভাবে জানান,
“এসআই জাহাঙ্গীর আলম জিডি মূলে আদালতে কোনো টাকা বা স্বর্ণ জমা দেননি।”
অন্যদিকে, সদর থানার একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়,
“এই ঘটনায় এসআই জাহাঙ্গীর আলম কোনো জিডি করেননি।”
তবে মৃত নারীর লাশ উদ্ধারের সময় ৬ ডিসেম্বর রাত ১১টা ২৫ মিনিটে ৫৫৭ নম্বর একটি জিডি করা হয়, যেখানে কেবল ‘অপমৃত্যু মামলা’ উল্লেখ রয়েছে। সেখানে উদ্ধার করা অর্থ বা স্বর্ণালংকারের কোনো বিবরণ নেই। এমনকি ওই জিডিটিও দীর্ঘদিন অনলাইনে আপলোড করা হয়নি।
লাশ উদ্ধার হলো, কিন্তু জব্দ তালিকা নেই—কেন?
জানা যায়, বগুড়া শহরের জামিল নগরে শাজাহান আলীর বাড়িতে সাবিকুন নাহার নামের ওই নারী ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করতেন।
৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যা থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে বাড়ির মালিক পুলিশে খবর দেন। রাত ৯টার দিকে পুলিশ দরজা ভেঙে বিছানায় পড়ে থাকা নারীর মরদেহ উদ্ধার করে।
বাড়ির মালিক শাজাহান আলী ও তার স্ত্রী শামিমা বেগম অভিযোগ করে বলেন,
“লাশ মর্গে পাঠানোর পর আমাদের সামনে ঘর তল্লাশি করে এসআই জাহাঙ্গীর আলম ২০ হাজার টাকা ও চার আনা স্বর্ণ উদ্ধার করেন। স্থানীয় আরও কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু কোনো জব্দ তালিকা করা হয়নি, কারও স্বাক্ষরও নেওয়া হয়নি।”
দাফনের আগে টাকা দাবি করার অভিযোগ
বাড়ির মালিক দম্পতির আরও অভিযোগ, ঘটনার দুই দিন পর এসআই জাহাঙ্গীর আলম তাদের ফাঁড়িতে ডেকে নিয়ে বলেন,
“মৃত নারীর তিন মাসের ভাড়া বকেয়া ও দাফন-কাফনের খরচ রয়েছে। উদ্ধার করা টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা না দিলে আমরা দাফনের দায়িত্ব নেব না।”
টাকা না পাওয়ায় তারা দাফনের দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানান। শেষ পর্যন্ত মানবিক সংগঠন আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম এগিয়ে এসে মরদেহের দাফন সম্পন্ন করে।
পুলিশ প্রশাসনের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ
বগুড়া পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর এরশাদুল বারী বলেন,
“একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ পুরো পুলিশ প্রশাসনের ভাবমূর্তিকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এখন সময়ের দাবি।”
পুনরাবৃত্ত দুর্নীতির অভিযোগ, তবুও বহাল তবিয়তে
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, এসআই জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিক দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ রয়েছে। শেরপুরে কর্মরত থাকাকালীনও তাকে নিয়ে নানা বিতর্ক ছিল। অভিযোগ রয়েছে, একাধিকবার ‘ক্লোজ’ হলেও রহস্যজনকভাবে আবার দায়িত্বে ফিরে আসেন তিনি।
ভুক্তভোগীরা সামাজিক সম্মানহানি ও মিথ্যা মামলার ভয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না বলে দাবি স্থানীয়দের।
এসআইয়ের বক্তব্য বনাম বাস্তবতা
এসআই জাহাঙ্গীর আলম পুনরায় দাবি করেন,
“মৃত নারীর পরিবার লাশ নিতে অস্বীকৃতি জানায়। উদ্ধার করা টাকা ও স্বর্ণ থানায় জিডি করে আদালতে জমা দিয়েছি।”
কিন্তু থানা ও আদালতের কোনো নথিতে তার এই দাবির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
প্রশ্ন থেকেই যায়
যদি টাকা ও স্বর্ণ আদালতে জমা হয়ে থাকে, তবে নথিতে তার কোনো রেকর্ড নেই কেন?
জব্দ তালিকা ছাড়া কীভাবে মালামাল উদ্ধার করা হলো?
বারবার অভিযোগ ওঠার পরও কেন কার্যকর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না?
সচেতন মহলের দাবি
বগুড়াবাসীর একটাই প্রত্যাশা—অভিযোগের ঊর্ধ্বে উঠে নয়, বরং অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত করে দোষী হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। অন্যথায় কয়েকজন বিতর্কিত কর্মকর্তার কারণে পুরো পুলিশ বাহিনীর সুনাম চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এ ঘটনায় এখনই নিরপেক্ষ তদন্ত ও কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে সচেতন মহল।